মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home সময়ের সাথে পেশা: তরুণ মনে অস্থিরতা

সময়ের সাথে পেশা: তরুণ মনে অস্থিরতা

ইমরান অনেক আনন্দ নিয়ে ঢাকা এসেছিল কারণ তার ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। সে ঢাকা মেডিক্যালে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছে। তার মা-বাবারও ইচ্ছা ছিল তাঁদের ছেলে বড় ডাক্তার হয়ে বংশের মান উঁচু করবে। কারণ তাদের বংশে কোনো ডাক্তার নেই। তার বাবা জামান সাহেবও মহা খুশি। তার বড় মেয়ে বিবিএ করে এখন এমবিএ করছে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে চাকরি পাচ্ছে না তাই কিছুটা মন খারাপ হলেও ছেলের সাফল্যে তিনি আজ অনেক খুশি। ইমরান মেডিক্যালে কৃতিত্বের সাথে সব পরীক্ষায় পাস করল। এখন সে ইন্টার্নিতে। ইন্টার্নি সে খুব মনোযোগের সাথে করছে। তার স্বপ্ন অনেক মায়া আর ভালোবাসা দিয়ে ডাক্তারি করবে। মানুষ অনেক সুনাম করবে তার সেবার।
এদিকে অনেক সিনিয়রদের সাথে দেখা যারা আগে পাশ করেছেন। তারা চাকরি পাচ্ছে কম, বেতনও কম। কষ্ট করে ঢাকার বাইরে যেয়ে চেম্বার করছেন অনেকে কিন্তু আশানুরূপ রোগী পাচ্ছেন না। কারণ সেখানে আগে থেকেই অন্যরা রোগী দেখছেন। আর সবাই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বয়স্ক ডাক্তার দেখাতে চান, কম বয়স্কদের না।
প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার নতুন ডাক্তার প্রায় ১০০টির বেশি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করছেন। আজকাল সবাই শহরমুখী। ইমরানের বাবার আশা ছেলে পাস করলেই তাকে বিয়ে দিবেন। ইমরান তার বাবার কাছে সবকিছু খুলে বলার পর তাদের হতাশা আরো বেড়ে যায়। ইমরানের বাবার বন্ধুর ছেলে বুয়েট থেকে পাশ করেও দেশে তেমন কিছুই করতে পারছে না। তার কিছু বন্ধুরা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরি না পেয়ে ব্যাংকে চাকরি শুরু করেছে হতাশাতে। সবাই ভালো ছাত্র। কিন্তু যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও চাকরির বাজারে সঠিক চাকরির অভাব।
এরকম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেও বহু মেধাবীরা বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ বা টিউশনি করে জীবন চালাচ্ছেন, কেউ কেউ ছোট ব্যবসা করছেন। কিন্তু তাদের শিক্ষা, মেধা, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দেশ উপকৃত হচ্ছে না, ইমরান তাই এখন চোখে স্বপ্ন না দেখে ভবিষ্যত অন্ধকার দেখছে।
বর্তমানে কোনো পরিবার তার সন্তানকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানাতে পারলে নিজেদেরকে সবচেয়ে বেশি সফল মনে করে। কিন্তু দিনকে দিন পেশার সুযোগ বৃদ্ধির ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত প্রতিযোগিতা তরুণদের মনে অস্থিরতা জন্ম দিচ্ছে। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়াতে শ্রম দিয়ে যখন দেখে তারা চাকরি হচ্ছে না বা বেতন অতি নিম্ন তখন সে হতাশ হয়ে পড়ে। একজন ডাক্তার যখন ৬ বছর পড়ে দেখে-গ্রামে পল্লী চিকিৎসকদের ভিজিট কম থাকার কারণে সবাই তাদেরকেই দেখাচ্ছেন তখন হতাশা তৈরি হয়।
অতীতের পেশাতেই বা প্রচলিত পেশাতেই তরুণদের চাকরি হবে বলে সবাই মনে করলেও বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। দিনকে দিন সব কিছুই ডিজিটালাইজ হবার কারণে অনেক পেশারই আগামী ১০ বছরে বিলুপ্তি হবে। আবার অনেক নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে, পেশা তৈরি হবে যা থেকে প্রচুর তরুণদের কর্মসংস্থান হবে। আমাদের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটির বেশি। WHO-এর মতে আমাদের বেকারত্বের হার দিনকে দিন বাড়ছে যা ২০০৬ সালে ছিল ৩%, আর ২০১৭ তে ৪.২%। পৃথিবীতে সবচেয়ে কম বেকারত্বের হার সিঙ্গাপুরে ২.১% ও সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ আফ্রিকাতে ২৭.২০%।
বেকার তরুণদের মধ্যে মানসিক সমস্যার হার তুলনামূলক বেশি। এজন্য তাদের মধ্যে মানসিক রোগের নানা উপসর্গ জন্ম নেয়। যেমন তারা-

  • বিষণ্ণতা রোগে ভোগেন
  • হতাশা থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন
  • নিজের ওপর উত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন
  • কাজে উৎসাহ হারিয়ে কাজ করতে ভয় পান

নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে করেন বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে আরো নতুন কিছু পেশার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হবে। যেমন-সৌরশক্তি টেকনিশিয়ান, বায়োএনার্জি টেকনিশিয়ান, বাসায় স্বাস্থ্য সেবার সুবিধার পেশা, ডাক্তারের সহকারী, সেবিকা, ফিজিক্যাল মেডিসিনের সহকারী, বিভিন্ন সফট্ওয়ার, অ্যাপ বানানোর পেশা, জিনগত সমস্যা বিষয়ক কাউন্সিলর, অকুপেশনাল থেরাপির সহকারী।
প্রতিটি দেশ তার চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ভবিষ্যত চিন্তা করে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে তাদের তরুণদের উৎসাহিত করে। অল্প খরচে তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে ও কর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণের সুবিধা প্রদান করে। যাতে তারা চাকরির খোঁজ না করে এই ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেই একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের বেকারত্ব নিরসন করতে পারে। পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তিত হচ্ছে আমাদের জলবায়ু। আমাদের এই আধুনিকায়নের যুগে পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। কর্মব্যস্ত দক্ষ তরুণরাই দেশের শক্তি। যেহেতু বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ আমাদের বাংলাদেশ তাই এখন থেকেই আমাদের পারিবারিকভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। অভিভাবকদের শুধু নিজের মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য সন্তানদের জোর না দিয়ে তাদের ভবিষ্যত জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে সঠিক পেশা গ্রহণের জন্য সহায়তা ও উৎসাহ দিতে হবে। তাহলেই হ্রাস পাবে বেকারত্বের হার। দেশ এগিয়ে যাবে উন্নতির শিখরে দেশের তরুণদের হাত ধরে। আমরা নিম্ন আয় থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হয়েছি।
আমাদের তরুণেরা যে যথেষ্ট প্রতিভাবান তার প্রমাণ আমরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দেখে থাকি। গণিত অলিম্পিয়াডে আমাদের সোনার ছেলেরা স্বর্ণপদক পায়, রোবট প্রতিযোগিতার বুয়েটের ছাত্ররা শীর্ষস্থান দখল করে, অনেক তরুণ-তরুণীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে এবং ডাক্তারদের পুরস্কার পেতে দেখি। তাদের সবরকম সুবিধা আমাদের দেশে দেয়া হলে তারা আমাদের দেশকে অতি শীঘ্রই মধ্যম থেকে উচ্চ আয়ের দেশে রূপান্তরিত করবে। সুতরাং সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে আমরা বেকার তরুণদের দেশের বোঝা বানিয়ে না রেখে তাদের সম্পদ তৈরিতে সবার সার্বিক সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
সূত্র: মনের খবর মাসিক, ম্যাগাজিন ১ম বর্ষ, ৯ম সংখ্যায় প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা। সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে বিভিন্ন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এই স্টিগমার পরিমান ৩৮-৯৮% পর্যন্ত দেখা গেছে। ২০১৯...

ইম্পোস্টার সিনড্রোম: নিজেকে অযোগ্য মনে করার রোগ

ইম্পোস্টার সিনড্রোম হলো এমন এক ধরণের মানসিক অবস্থা যে একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা বা অর্জনকে সন্দেহের চোখে দেখে ও নিজেকে অযোগ্য মনে করে। মনে...

আমার কোন কিছু খেয়াল থাকে না!

সমস্যা: আমার নাম ছাইম আহাম্মেদ। আমি অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র। আমার সমস্যাটি হচ্ছে, আমি কিছুই মনে রাখতে পারি নাহ। ধরুন, এখন ১০ মিনিট পড়লাম...

স্ট্রেস থেকে মুক্তি পেতে যা করতে পারেন

অফিস থেকে বাড়ি, সব জায়গায় কম-বেশি রয়েছে কাজের চাপ। অফিসে বসের ধমক, বাড়িতে রোজকার ঘরোয়া কাজ, জীবন যেন ষোলো আনাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আর...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন