মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home সখী ভালোবাসা কারে কয়

সখী ভালোবাসা কারে কয়

১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস। এই দিবসকে নিয়ে চলছে নানা আয়োজন মানব-মানবীর মধ্যে। সঙ্গে সেই শাশ্বত প্রশ্ন- ভালোবাসা আসলে কী? যুগে যুগে মানবমানবীর প্রেম-ভালোবাসাকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে কত না ইতিহাস। তবু প্রশ্ন রয়ে যায় আজ অবধি সত্যিকারের ভালোবাসা কাকে বলে? চলুন কিছুটা আলোকপাত করি এই বিষয়টির ওপর। তবে আজকে আমি শুধু মানবমানবীর ভালোবাসা প্রসঙ্গ নিয়েই লিখব।
ভালোবাসা হলো গভীর মমতাবোধের তীব্র অনুভূতি। এটি একটি আবেগীয় অবস্থা। এটি ইতিবাচক আবেগের একটি উদাহরণ। শারীরবৃত্তীয়ভাবে বলা হয়- মানুষ যখন প্রথম কারো প্রতি আকর্ষণ বা ভালোবাসা অনুভব করে তখন তিনটি নিউরোকেমিক্যালের সমন্বয়ে এক ধরনের উত্তেজনা বা আলোড়ন অনুভব করে। নিউরোকেমিক্যালগুলো হলো- ফিনাইল থেলামাইন, নড়ইপিনিফ্রিন এবং ডোপামিন। দীর্ঘমেয়াদি ভালোবাসার সম্পর্ক পরবর্তীতে আরো দুটি হরমোন দ্বারা পরিচালিত হয়। এগুলো হলো- অক্সিটোসিন ও সেরোটোনিন। তবে কখনো কখনো এই অনুভূতিটিকে ব্যাখ্যা করা ভীষণ কঠিন। তবে সাধারণ ভাষায় বলা যায়- কাউকে ভালোবাসা মানে ইতিবাচক তীব্র আকর্ষণ ও অনুভূতির পাশাপাশি তার প্রতি প্রেমময় আচরণ প্রকাশ করা। প্রায়ই সঙ্গীদের মধ্যে সত্যিকারের ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন জাগে- সে কি আমায় সত্যিকারের ভালোবাসে?
এখন আসি, সত্যিকারের ভালোবাসা বলতে আমরা কী বুঝি। মনোবিজ্ঞানী রবার্ট স্টার্নবাগের মতে, সত্যিকারের বা সবচেয়ে উন্নত ভালোবাসায় তিনটি উপাদান থাকবে : ১. আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা (Intimacy)  ২. জৈবিক বা রোম্যান্টিক আকর্ষণ (Passion) ও ৩. দায়বদ্ধতা (Commitment) সহজ ভাষায় এটি হলো একটি শক্তিশালী, দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক আবেগীয় অনুভূতি ও কার্যক্রম, যা দু’জন সঙ্গীকে একটি সম্পর্কে সুখী করে এবং পরিপূর্ণতা দান করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন দম্পতি ৫০ বছরের বিবাহিত জীবনে যদি একইভাবে দু’জন দু’জনের প্রতি ইতিবাচক আবেগীয় অনুভূতি অনুভব করে এবং গভীরভাবে একে অপরের প্রতি যত্নশীল হয়, তাহলে বলা যায় তারা দু’জন দু’জনকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসে। এই অনুভূতি একতরফা ভাবেও হতে পারে। সত্যিকারের ভালোবাসা তখনি হয়, যখন কেউ সঙ্গীর জন্য কিছু করতে গিয়ে কঠিন কষ্টকেও কষ্ট মনে করে না এবং ভেতর থেকে তার প্রতি তীব্র আকর্ষণ ও আন্তরিকতা অনুভব করে।
সাধারণত সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা থাকলে একে অপরের প্রতি সম্মানবোধ, গ্রহণযোগ্যতা, স্বার্থহীনতা, বিশ্বাস, অনুভূতি প্রকাশের জায়গা, একে অপরের সঙ্গকে উপভোগ করা এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্খা প্রভৃতি বিষয় লক্ষ্য করা যায়। সত্যিকার ভালোবাসা অধিকাংশ সময়ই শর্তহীন হয়। ব্যক্তি নিজের চেয়ে সঙ্গীর ভালোর দিকে অধিক মনোযোগী হয়। সঙ্গী যেমন ব্যক্তি ঠিক তেমনভাবেই তাকে পছন্দ করে। তাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা বা উদ্দেশ্য থাকে না। এখন আসি, সত্যিকারের ভালোবাসা কি সবসময় বজায় রাখা সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব, তবে যে কোনো সম্পর্কে ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি, অসন্তুষ্টি কিংবা অসঙ্গতি থাকতেই পারে; তবে একটি সুস্থ ভালোবাসার সম্পর্কে এই বিষয়গুলো দীর্ঘদিন একইভাবে চলমান থাকে না। সত্যিকারের ভালোবাসা বা ভালোবাসার সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে (যেমন : বোঝাপড়া, যত্নশীলতা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধাশীলতা, দায়িত্ববোধ) স্থির থাকে। এক্ষেত্রে দু’জনেই আন্তরিক থাকেন সম্পর্কটিকে ভালো রাখার জন্য। তবে কেন ভালোবাসা কষ্ট দেয়, আসল কথা হলো যতক্ষণ মানুষের মধ্যে পূর্ণ ভালোবাসার অনুভূতি থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘ভালোবাসা’ মানুষকে কষ্ট দেয় না। যখনই এর সঙ্গে অন্য কোনো অনুভূতি যোগ হয়ে যায় যেমন- ইগো কিংবা হীনম্মন্যতা, তখনই সম্পর্কটি আগের রূপ হারায়। যেকোনো পুরনো পরিস্থিতি নতুন রূপ নিলে তার সঙ্গে উপযোজন করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেদনাদায়ক হয়। ব্যক্তি তখন এই পরিস্থিতিতে নিজেকে ভালোবাসাহীন মনে করে বা সে ভালোবাসার অভাববোধ করে। আর তখন থেকেই ব্যক্তির জীবনে আরো কিছু অনুভূতির আবির্ভাব হয়। সে তখন আশাহত হয় কিংবা তার লালিত স্বপ্নগুলো ভেঙে গেছে বলে মনে করে, কখনো নিজেকে অবহেলিত বা অবাঞ্ছিত বা অবমূল্যায়িত বলে মনে করে।
একটি ভালোবাসার সম্পর্কে ব্যক্তি নিজেকে যখন অবহেলিত, অবাঞ্ছিত বা অবমূল্যায়িত মনে করে, তখনই সে ভালোবাসা থেকে কষ্ট পেতে শুরু করে। সেটা হতে পারে সত্যিই পারিপার্শ্বিক কোনো পরিবর্তনের জন্য কিংবা ব্যক্তির নিজস্ব হীনমন্যতা, নিরাপত্তাহীনতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধের অভাবের জন্য। এই অবস্থায় ব্যক্তি ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যে থেকেও নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবে। এই অবাঞ্ছিত অনুভূতিগুলো একতরফাভাবে একজনের হতে পারে কিংবা দু’জনের মধ্যেও চলতে পারে। তবে তখন তা ভালোবাসার সম্পর্ক থেকে ধীরে ধীরে হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, প্রতিযোগিতা এমনকি শত্রুতার সম্পর্কেও রূপ নিতে দেখা যায়। ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে, যেখানে মানুষ তার পছন্দের মানুষের প্রতি তীব্র আকর্ষণ ও ভালোবাসা অনুভব করলেও পরবর্তীতে তার অনিষ্ট এমনকি তাকে হত্যা করতেও পিছপা হয়নি।
তবে এই পরিণতি আর যা ই হোক ভালোবাসার পরিণতি নয়। ভালোবাসার পরিণতি কখনো নিষ্ঠুর কিংবা নৃশংস হতে পারে না। সত্যিকারের ভালোবাসলে সবসময় ব্যক্তি যেভাবে চেয়েছে, সেভাবে পেতেই হবে সেটা আশা না করে ভালোবাসার মানুষটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে মেনে নেয়। তখন ভালোবাসার মানুষটির দুর্বলতা, অপারগতাকে বড় করে না দেখে বরং সবসময় তার মঙ্গল কামনা করে যায়। তার উন্নতি কামনা করে, তার সুখে সুখী হয়, দুঃখে দুঃখী হয়। সেটা দু’জনে কোনো সম্পর্কের মধ্যে থাকুক বা না-ই থাকুক। শুধু মানব-মানবীর ভালোবাসা নয়, প্রতিটি মানুষ তাদের নিজ ক্ষেত্র থেকে তার মা-কে, ভাইকে, সন্তানকে কিংবা তার নিজের দেশকে সত্যিকারের ভালোবাসে, তবে ভালোবাসার ধর্ম অনুযায়ী নিঃস্বার্থভাবে সে চাইবে যে সে যাদের ভালোবাসে তারা ভালো থাকুক, সুখে থাকুক এবং তাদের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটুক। তাই চাই, যুগে যুগে ভালোবাসা চিরজীবী হোক। আসুন আমরা আমাদের অন্তরকে বিকশিত করি, ভালোবাসতে পারার যোগ্যতা অর্জন করে নিজেদের সুন্দর ও নির্মল করি।

সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহিদ
সহকারী অধ্যাপক(ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি) মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা। সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে বিভিন্ন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এই স্টিগমার পরিমান ৩৮-৯৮% পর্যন্ত দেখা গেছে। ২০১৯...

ইম্পোস্টার সিনড্রোম: নিজেকে অযোগ্য মনে করার রোগ

ইম্পোস্টার সিনড্রোম হলো এমন এক ধরণের মানসিক অবস্থা যে একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা বা অর্জনকে সন্দেহের চোখে দেখে ও নিজেকে অযোগ্য মনে করে। মনে...

আমার কোন কিছু খেয়াল থাকে না!

সমস্যা: আমার নাম ছাইম আহাম্মেদ। আমি অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র। আমার সমস্যাটি হচ্ছে, আমি কিছুই মনে রাখতে পারি নাহ। ধরুন, এখন ১০ মিনিট পড়লাম...

স্ট্রেস থেকে মুক্তি পেতে যা করতে পারেন

অফিস থেকে বাড়ি, সব জায়গায় কম-বেশি রয়েছে কাজের চাপ। অফিসে বসের ধমক, বাড়িতে রোজকার ঘরোয়া কাজ, জীবন যেন ষোলো আনাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আর...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন