মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home চিকিৎসা নিয়ে ভয়

চিকিৎসা নিয়ে ভয়

পর্ব ১: আমার একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক একটা কথা প্রায়ই বলেন, এবং কথাটা সর্বসাধারন এবং পেশাগত প্রত্যেকেরই জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তিনটা ক্ষেত্রকে পৃথক রাখার উপর খুব জোর দেন: মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, মানসিক রোগের চিকিৎসা এবং মানসিক রোগের প্রতিরোধ। যেসব বিষয় মানসিক স্বাস্হ্য উন্নয়নের সেগুলো হরে দরে যদি রোগের চিকিৎসায় কেউ ব্যবহার করতে যায় তাহলে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। স্যারের উদাহরনটাই উল্লেখ করছি : কারো পায়ের হাড় ভেংগে গেছে, এই অবস্থায় তাকে যদি সবাই ঠেলতে থাকে হাঁটো, দৌড়াও, খেলো-এগুলো হাড়ের জন্য ভালো ; তাহলে কি অবস্থা হবে ভাবুন। আবার যখন ছয় সপ্তাহ বিশ্রাম নিয়ে তারপর এক্সরে করে হাড় ভাংগা ঠিক হয়ে গেছে তখন তাকে সারাদিন শুয়ে থাকতে বললে, ঐ পা না নাড়াতে দিলে তার মাংসপেশি শুকিয়ে পরে ঐ পায়ের অবস্থা বারোটা বাজবে।
এখন প্রশ্ন করতে পারেন কে ঠিক করবে যে পায়ের প্লাস্টার কেমনে দেয়া হবে, কতদিন বিশ্রাম নেবে, কি ব্যায়াম করবে- অবশ্যই অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ অথবা এই বিষয়ে পেশাগত প্রশিক্ষন আছে অথবা ইমার্জেন্সি ভাবে একজন এমবিবিএস এই পরামর্শগুলো দিবেন।
এখন এই ক্ষেত্রেও যেমন মান্ডার তেলের ব্যবসায়ীরা আছেন এখানেও সেরকম তিন অংশকে ‘ঘেঁটে ঘ’ বানানোর লোকের অভাব নাই। এবং মুশকিল হচ্ছে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, চোখ ঠারানো মুগ্ধতা দিয়ে মানসিক রোগের উপসর্গকে স্বআভাবিক বানানো থেকে শুরু করে ওষুধের চিকিৎসা কে ঋনাত্মক বানানো সবই হয়ে চলেছে।
কে ওষুধ খেলো বা খেলো না তাতে আর কারো কিছু যায় আসেনা। কিন্তু কিছু জায়গা বড় ভয়ংকর ফল নিয়ে আসে- যেমন প্রসব পরবর্তী বিষন্নতা একজন মায়ের মনোজগত তার ছোট্ট শিশুর বিকাশে বিশাল ভূমিকা রাখে, সেই জায়গা ব্যহত হয়, মায়ের নিজের ব্যক্তিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়; ভ্রান্ত বিশ্বাসজনিত অসুখ – এগুলোর প্রভাবে হত্যা, আত্মহত্যা ঘটে যায়।
আবার বিষন্নতার চিকিৎসা না করে, ওষুধ না খেয়ে সারাদিনব্যাপী মোটিভেশনাল কথাবার্তা পড়ে পড়ে আস্তে আস্তে সেটার মধ্যে ডুবে যাওয়া- মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট কেমিক্যালের যখন ঘাটতি তখন মোটিভেশনের কথার অর্থেও ঝামেলা হয়- শুয়ে থেকে পৃথিবী জয় করা যায় এই স্বপ্ন দেখে খাট থেকে পড়ে গিয়ে বাস্তবতায় এসে আরো বিষন্ন লাগার সম্ভাবনা আসে।
পর্ব ২: মোটামুটি হতবিহবল একটা চাহনীসহ জনৈকের প্রশ্ন: ওষুধ খেতেই হবে? এটা নিজে নিজে ঠিক হবেনা? ওষুধ খেলেতো পুরো পাগল বলবে আমাকে সবাই? কথা বলে ঠিক করা যাবে না?
ডাক্তার: আপনি চুলায় আগুন না ধরিয়ে চুলার উপর হাঁড়ি বসালেন, অনেক মশলাপাতি দিলেন, অনেক নাড়লেন, ঘুঁটলেন- রান্না হয়ে যাবে? এটাও তেমন -আপনার মস্তিষ্কে যতটুকু কেমিক্যাল এবং সেগুলো যেভাবে কাজ করার কথা সেই জায়গাটা আগে ঠিক হয়ে আসতে হবে। তখন এই নিজে নিজে চেষ্টা করা, কথা বলা এগুলো করতে পারবেন। এখন এগুলো ঐ আগুন ছাড়া রান্নার মতো। আর শুধু কথা বলার থেরাপী যতটা লাগবে তার চেয়ে কম আঁচ দেয়ার মতো। রান্না হবে হয়তো, কিন্তু এত দেরীতে যে লাঞ্চেরটা ডিনারে গড়াবে। সবার কথাতো সবার কথাই। যে অন্ধ হয়েও সাদা লাঠি নিয়ে হাঁটে, সবাই তাকে উপহাস করার কথা নাকি সাহসী হিসেবে প্রশংসা করার কথা? তার এই মনের জোর কে প্রশংসা না করে বরং উপহাস করে অনেকে, কিন্তু অনেকের কথায় নিশ্চয়ই দমে যাওয়ার কিছু তার নাই। আপনি ওষুধ খেয়ে ভালো থাকলে, কাজ করতে পারলে সেটা বেশি শক্তির পরিচয় নাকি সমস্যাটার চিকিৎসা পেয়েও এড়িয়ে গেলে?

ডা. সৃজনী আহমেদ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল, মগবাজার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

করোনাকালে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব নিয়ে মনের খবর নভেম্বর সংখ্যা প্রকাশিত

দেশের অন্যতম বহুল পঠিত মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন মনের খবর এর নভেম্বর সংখ্যা। অন্যান্য সংখ্যার মত এবারের সংখ্যাটিও একটি বিশেষ বিষয়ের উপর প্রাধান্য...

অবিবাহিতদের মানসিক স্বাস্থ্য বনাম বিবাহিতদের মানসিক স্বাস্থ্য

আমাদের সমাজে অবিবাহিত বা বৈবাহিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলা মানুষদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেকেই মনে করেন বৈবাহিক সম্পর্ক এড়িয়ে চললেই সবাইকে নিয়ে সুখী...

পরিবেশ দূষণ মনের ওপর যেসব প্রভাব ফেলে

আমাদের চারপাশের ভৌত অবস্থা, জলবায়ু, জৈবিক এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তির সামষ্টিক রূপটিই হচ্ছে পরিবেশ। কোন ব্যবস্থা বা জীবের অস্তিত্ব বা বিকাশের জন্য তার উপর...

বায়ু দূষণ করোনাভাইরাসে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ায়

বিশ্বে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে যত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন তার ১৫ শতাংশের পেছনে ভূমিকা রেখেছে লম্বা সময় বায়ু দূষণের প্রভাব, এমন দাবি করছেন গবেষকরা। বায়ু দূষণ...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন