মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home সাত কারণে ফেসবুক মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

সাত কারণে ফেসবুক মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

মানুষ দীর্ঘদিন যা চেয়েছে, তাই দিয়েছে ফেসবুক। সুদূর বিদেশের কোনো আত্মীয়, হয়ত স্কুল বদলের কারণে হারিয়ে ফেলা কোনো বন্ধু, এমনকি বিভিন্ন গন্ডির জানাশোনা পরিচিতজনদের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে নিমিষেই। পোস্টকার্ডের কোনো খরচের দরকার হয় না আর। সেই বিদেশি আত্মীয়ের মেয়ে সকালে কি খেয়েছে বা সেই পুরান বন্ধুর কুকুরটা নতুন কি কাণ্ড করল – একটি ক্লিকেই জানা যাচ্ছে। উল্কার বেগে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ফেসবুক।
তবে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের সুবিধা-উপকারের মতই এক্ষেত্রেও দিতে হয় কিছু অদৃশ্য মানসিক মূল্য। একটি বিশদ গবেষণায় দেখা গেছে, খুব বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা আর বিচারক্ষমতা সময়ের সাথে সাথে কমে যায়। গবেষণার ভিত্তিতে সাতটি উপায় দেখানো যায়, ফেসবুক যেভাবে ব্যবহারকারীদের ক্ষতি করে:
১. আমার জীবন অন্যদের মত ভাল নয়
সমাজ বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক লিওন ফেস্টিঞ্জার দেখেছেন, সহজাতভাবেই অন্যের সাথে সামাজিক অবস্থানের তুলনার ঝোঁক রয়েছে মানুষের মধ্যে। ‘আমি গড়পড়তা মানুষের চেয়ে ভাল না খারাপ করছি?’ – প্রশ্নে মানুষ নিজেদের মতই অন্য কাউকে খোঁজে তুলনার জন্য। বিনা পরিশ্রমে এই সামাজিক তুলনার ভাল মাধ্যম ফেসবুক। ফেসবুক নিউজফিডেই দেখা মেলে কোনো বন্ধুর বড় কোনো রেস্তোরাতে খাবার ছবি বা হয়ত কোনো বন্ধুর কোনো পেশাগত পদক পাওয়ার ছবি। অন্যে বেশি ভালোভাবে জীবন পার করছে, আমার প্রতিই ভাগ্য নিষ্ঠুর- ফেসবুকের দীর্ঘদিনের ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই ভুল ধারণা গড়ে ওঠে মনের অজান্তেই।
২. বন্ধু বা বান্ধবীদের সাফল্যে হিংসা
বন্ধু বান্ধবীর চাকরিতে পদন্নোতি বা নতুন গাড়ি কেনার খবর বা সেন্টমার্টিন অথবা বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার খবর আজকাল ফেসবুকেই জানা যায়। এই আনন্দের ভাগীদার হবার চেয়ে বহুগুণে তা হিংসার জন্ম দেয়। বাক্সম্যান এবং ক্রাসনোভা তাদের গবেষণায় দেখেছেন, আপনি যদি শুধু নিজের ফেসবুক নিউজ ফিডে ওপর থেকে নিচে দেখতে থাকেন- এতেই সুপরিচিত কারো ভ্রমণ বা যে কোনো সাফল্য ঐ ব্যবহারকারীর মনে হিংসা সৃষ্টি করতে পারে।
৩.ভুল ধারণার জন্ম
সার্চ ইঞ্জিনে একই বিষয়ে সার্চ করলেও পাশাপাশি দুইজনকে দুই রকম ফলাফল দেখাতে পারে। সার্চ ইঞ্জিনের মতই ফেসবুকেও ব্যক্তির ব্যবহারের ওপর তার নিউজফিড সাজানো হয়। আপনি নিউজফিডে তাদের স্ট্যাটাস ছবি বেশি দেখেন, যাদের লাইক দেয়ার বিষয়ের সাথে আপনার লাইকের অর্থাৎ পছন্দের মিল আছে। হতে পারে কোনো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নেতিবাচক দিক নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন ফেসবুকে। আপনার নিউজফিডে সেইসব স্ট্যাটাস, ছবি বেশী দেখানো হবে। যেগুলো দেখে আপনার ভুল ধারণার সৃষ্টি হয় যে বেশিরভাগ মানুষ আপনার মতই ভাবে। যেটি সামগ্রিকভাবে সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
৪.ব্যক্তিজীবনে ভুলে যাওয়া অপ্রয়োজনীয় মানুষের কার্যক্রম
হয়ত প্রেমঘটিত সম্পর্কে কোনো যুগলের সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে। ভবিষ্যতে তাদের জীবন আলাদা। কিন্তু ফেসবুকে এক ক্লিকেই একজন অন্যজন কি করছে তা দেখতে পারে। একজনের মনে হতে পারে, তার প্রেমিক বা প্রেমিকা সম্পর্কছেদে তার চেয়ে কম কষ্ট পেয়েছে। এভাবে কারো মানসিক অশান্তি শুধু শুধু বাড়ে। ফেসবুকে এই সুযোগ না থাকলে হয়ত নিজের মতই নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারত। শুধু তাই নয় দেখা গেছে, সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর নিজের প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকা বা স্বামী বা স্ত্রীর সাথে সরাসরি কথা বলার চেয়ে ফেসবুকে মাঝে মাঝে তার ওয়ালে যাওয়া, কারো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর।
৫.সঙ্গীর প্রতি ঈর্ষাপরায়নতা
হয়ত কারো সঙ্গীর স্ট্যাটাস বা ছবিতে তার কোনো প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকা বা বিপরীত লিঙ্গের অন্য কেউ মাঝে মাঝেই লাইক দিচ্ছে, কমেন্ট করছে। তার সঙ্গীও হয়ত আন্তরিকভাবেই প্রতিউত্তর করছে বা কারো সাথে বেশি যোগাযোগ করছে ফেসবুকে। এই বিষয়গুলো যে কোনো ফেসবুক ব্যবহারকারীর মনে তার সঙ্গীর জন্য ঈর্ষাপরায়নতার সৃষ্টি করে। ‘ফেসবুক এন্ড ইওর ম্যারিজ’ এর লেখিকা ক্রাফস্কি বলেন দাম্পত্য জীবন বা প্রেমঘটিত সম্পর্কের অনেক সমস্যাই আজকাল ফেসবুক ব্যবহারের কারণে হয়।
৬.বসকে জানাতে চান না এমন তথ্য প্রকাশ
হয়ত সঙ্গীকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন বা কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গেছেন অফিস থেকে আগেভাগে বের হয়ে। অবশ্যই বসকে জানাতে চান না। কিন্তু ফেসবুকের কল্যাণে আপনার বস জেনে যেতে পারে এমন কোনো তথ্য।  হয়ত সেটিংসের মাধ্যমে তা লুকিয়ে রেখেছেন বসের কাছে। কিন্তু অফিসেরই কারো মারফত তা জেনে যেতে পারে আপনার বস। যা পেশাগত জীবনে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
৭.ফেসবুকে আসক্তি
চা, সিগারেট, মদ সমাজের মানুষের অন্যতম আসক্তি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু সম্প্রতি DSM-V (Diagnostic and Statistical Manual) বিতর্কিত এক নতুন আসক্তি তালিকায় ঢুকিয়েছে- ইন্টারনেট আসক্তি। তার মধ্যে ফেসবুক আসক্তি মিডিয়া নিউজের কল্যাণে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গবেষক হফম্যান এবং তার সহকর্মীরা বাছাইহীন ভাবে অনেককে ম্যাসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘কোনটি ছাড়া একদিনও চলবে না?’ দেখা গেছে, সিগারেট বা কোনো মাদকদ্রব্যের চেয়ে যে উত্তরটি বেশি এসেছে- তা হলো সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেসবুক।
যদিও নেতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু ভাল দিকও আছে। যেমন ফেসবুক একাকীত্ব কমায়। তবে যেহেতু অন্য যে কোনো প্রযুক্তির মতই এটি একটি প্রযুক্তি; সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে তা জীবনকে বিভীষিকাময় করে ফেলবে।
সাইকোলজি টুডে অবলম্বনে,
মাসাফি আহমেদ ফেরদৌস অনিক

2 COMMENTS

    • আপনার প্রশ্নের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নের উত্তর খুব শীগ্রই মনের খবরের প্রশ্ন-উত্তর বিভাগে পাবলিশ করা হবে। পরবর্তীতে আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে পুরো প্রশ্ন কমেন্টসে না দিয়ে সমস্যা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য পাঠিয়ে দিন এই ইমেইলে – question@www.monerkhabor.com ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

মহামারি ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত

করোনা মহামারিতে ৫ মাস বিরতির পর প্রকাশিত হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক দেশের অন্যতম বহুল পঠিত মাসিক ম্যাগাজিন মনের খবর এর সেপ্টেম্বর সংখ্যা। অন্যান্য সংখ্যার...

সামাজিক দূরত্ব এবং সম্পর্কের বোঝাপড়া

মহামারীতে সামাজিক দূরত্বের সাথেসাথে দূরত্ব বেড়েছে সম্পর্কগুলোর। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়াতে বন্ধু/বান্ধবীর সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই মুঠো ফোনটাই। আটকে পরেছে দেশের বিভিন্ন...

সম্পর্কে অসন্তুষ্টি এবং কিছু ভুল ধারণা

সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত রক্ষণশীল মনোভাব এবং আমাদের বেশ কিছু ভুল ধারণা আমাদের মাঝে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করে। আর এই অসন্তুষ্টি দূর করতে গিয়ে অনেকে প্রায়শই...

মহামারীতে মানসিক চাপের উপশম করবে পোষা প্রাণী

মহামারীর এই দুঃসময়ে মানসিক অশান্তি এবং দুশ্চিন্তা কমাতে সহায়তা করতে সক্ষম ঘরে থাকা পোষা প্রাণী। মনস্তত্ত্ব বিদ্যা এমনটাই বলছে। মহামারীর এই দুঃসময়ে বাড়তে থাকা একাকীত্ব,...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন