মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home মানসিক রোগে শারীরিক উপসর্গ- কিস্তি ৩

মানসিক রোগে শারীরিক উপসর্গ- কিস্তি ৩

আজকের দিনটি মীমের কাছে বড়ই  কাঙ্ক্ষিত ছিল। ক্লাস সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে দুই দিন আগে। পরীক্ষা শেষের আনন্দের চেয়েও মুখ্য ছিল বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ। প্রায় দুই বছর পর বাবার সাথে তার দেখা। কি কথা বলবে, কোথায় বেড়াতে যাবে সব কিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু সকালে হঠাৎ করেই তার শরীরটা কেমন জানি খারাপ হয়ে গেলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
জ্ঞান ফেরার পর মীম নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করল। তখন বুঝতে পাড়ল যে সে কোনো কথা বলতে পারছে না। কিন্তু তার তো অনেক কথা বলার আছে। বাবা তো আজই আবার চলে যাবেন। আর কবে আসবেন তারও কোনো ঠিক নেই। গত চার বছর ধরেই তো সে তার মায়ের সাথে অন্য একটি শহরে বাবার কাছ থেকে আলাদা থাকছে। বাবা-মার ডিভোর্স হয়েছে চার বছর আগে।
এদিকে ডাক্তাররা তার বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন। রিপোর্টে যদিও কোনো শারীরিক রোগ ধরা পড়েনি তবুও মনে হয় শরীর ভালো না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালেই থাকতে হবে।
আসলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে মীমের রোগটির নাম কনভার্সন ডিসঅর্ডার (Conversion Disorder)। এক সময় রোগটি হিস্টিরিয়া (Hysteria) নামে পরিচিত ছিল। এখনও এ নামটি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত একটি নাম। মূলত, গ্রিক শব্দ Hystera মানে হচ্ছে জরায়ু (Uterus)। আর এ ধরনের রোগ যেহেতু নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যেতো তাই ধারণা করা হতো যে, জরায়ুর অস্বাভাবিক অবস্থান কিংবা ঘূর্ণনের ফলে এ রোগ সৃষ্টি হয়।
কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো যে এ রোগ যে শুধু মেয়েদের মধ্যে হয় তা না, পুরুষদের মধ্যেও এ ধরনের রোগ দেখা যায়। এ রোগ সব বয়সের এমনকি শিশুদেরও হতে পারে। সর্বশেষে এটা প্রমাণিত হলো যে মানসিক চাপ কিংবা দ্বন্দ্ব শারীরিক উপসর্গে রুপান্তরিত হওয়াটাই এ রোগের কারণ। আর এ জন্যই রোগটির নাম কনভার্সন ডিসঅর্ডার যা আক্ষরিক অর্থে রুপান্তরিত রোগও বলা যেতে পারে।
রোগের উপসর্গ দেখে মনে হতে পারে রোগী শারীরিক কোনো রোগে আক্রান্ত। কিন্তু অবচেতন মনের দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে রোগীর অজান্তেই বিভিন্ন ধরনের শারীরিক উপসর্গ তৈরি হয়। যখন মানুষ কোনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে তখন অবচেতন মনে যে চাপ  সৃষ্টি হয় সেটাকেই মনের দ্বন্দ্ব বলে। রোগী যখন তা মুখে প্রকাশ করতে পারে না তখন অবচেতন মন দ্বন্দ্বজনিত উৎকণ্ঠা প্রশমনের উপায় খুঁজে নেয়। প্রকাশ পায় বিভিন্ন ধরনের শারীরিক উপসর্গ। এর মধ্যে খিঁচুনী, কাঁপুনী, হাত পা নাড়াতে অসমর্থ বা অবশ, শরীরের বিশেষ কোনো অংশে বা সারা শরীরে স্পর্শের অনুভূতি লোপ পাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, কথা বলতে না পারা, খাবার গিলতে অসুবিধা এমনকি দৃষ্টি কিংবা শ্রবণশক্তিও লোপ পেতে পারে।
কাজেই এ ধরনের রোগীকে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা আবশ্যক। রোগীর উপসর্গ প্রশমনের চেয়েও বেশি প্রয়োজন নেপথ্যের কারণ খুঁজে বের করা। রোগী যত তাড়াতড়ি তার মনের কষ্ট তথা দ্বন্দ্বকে জয় করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে তার সুস্থ হয়ে উঠার সম্ভাবনা ততই বেশি।
চলবে…
ডা. সুস্মিতা রায়
সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগ বিভাগ
জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ, সিলেট


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

অধ্যাপক ডা. সুস্মিতা রায়
অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ, সিলেট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

কোভিড ১৯ প্রেক্ষিতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত জরুরি: রোকসানা আক্তার

কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বিরাট পরিবর্তন এসেছে আমাদের জীবনযাত্রায়। পরিবর্তন এসেছে আমাদের দৈনন্দিন রুটিনে। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে কেমন কাটছে সাধারন মানুষের জীবনযাপন, কি...

শাস্তি নিশ্চিত হলেই কি ধর্ষণ কমে যাবে: অনলাইন জরিপ

ধর্ষণ সহ নারী নির্যাতনের ঘটনা যেন প্রতিনিয়ন বেড়েই চলেছে আমাদের দেশে। কোনোভাবেই যেন তা রোধ করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি জন দাবীর মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ...

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা

মানসিক রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্টিগমা সবচেয়ে বড় বাধা। সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে বিভিন্ন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এই স্টিগমার পরিমান ৩৮-৯৮% পর্যন্ত দেখা গেছে। ২০১৯...

ইম্পোস্টার সিনড্রোম: নিজেকে অযোগ্য মনে করার রোগ

ইম্পোস্টার সিনড্রোম হলো এমন এক ধরণের মানসিক অবস্থা যে একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা বা অর্জনকে সন্দেহের চোখে দেখে ও নিজেকে অযোগ্য মনে করে। মনে...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন