মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু

Home তুই সে আমার মন : তৃতীয় কিস্তি

তুই সে আমার মন : তৃতীয় কিস্তি

মনের উপাসনা
science without religion is lame,
religion without science is blind.
…. Albert Einstein
আইনস্টাইনের বক্তব্যটি ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘর্ষ সমন্বয়ের বিতর্কে কতটা যৌক্তিক বা কতটা অযৌক্তিক তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আইনস্টাইনের কথাটির আদি ভিত্তি যে অত্যন্ত মজবুত তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকে না। বিশেষ করে আনাক্সাগোরাসের আলোচিত সেই ‘নউস’ বা প্লেটোর কল্পনার জগৎ যখন স্টোয়িক দর্শনের প্রবক্তা দার্শনিক ও গণিতবিদ জেনোর হাত ধরে ‘লগোস” ধর্মে রূপান্তরিত হয়।
এছাড়াও প্রাচীন মিশরের ধর্ম ও বিজ্ঞান চর্চা একীভূত রূপ অথবা প্রাচীন ভারতে বেদ নির্ভর বিজ্ঞান ও চিকিৎসা চর্চা আইনস্টাইনের বক্তব্যকে আরো সুদৃঢ় করে। চলতে থাকে মনের অনুসন্ধানের পাশাপাশি মনের উপাসনাও।
মনোবিজ্ঞানের পাশাপাশি এই লগোসের একটি সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক গুরুত্বও রয়েছে। জেনোর প্রবর্তিত এই ‘লগোস’ পরবর্তীতে খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্ম হয়ে পারস্যের সুফিবাদে প্রভাব ফেলে। সুফিবাদের ফানা ফিল্লাহ বা বাকা বিল্লাহরই আদি রূপ হচ্ছে আনাক্সাগোরাসের ‘নউস’ নির্ভর জেনোর ‘লগোস’। যা প্রাচ্যের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা বুদ্ধের নির্বাণ বা চৈতন্যের অচিন্ত্য ভেদাভেদ তত্ত্বের মৌলিক বিষয়ের অনুরূপ। যার কারণে সুফি, নির্বাণ এবং চৈতন্যের ঐক্যবদ্ধ ভাবধারায় সাধিত হয় প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের এক মহান আত্মিক ঐক্য।
শুধু তাই নয়, চাইনিজ তাওবাদের মৌলিক ভিত্তিও এই ‘লগোস’ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে ১৯১২ সালে প্রখ্যাত সুইস মনোবিজ্ঞানী ‘কার্ল জং’ এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ্যানালিটিক্যাল সাইকোলজি’ নামে মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরবর্তী লেখায় আমরা প্রাচীন ভাববাদ কিভাবে মধ্যযুগীয় সাহিত্য দর্শনের মাধ্যমে এনালিটিক্যাল সাইকোলজির ভিত্তমূল প্রতিষ্ঠা করে তা জানতে পারবো।
যাহোক, এবারের প্রসঙ্গ হচ্ছে লগোস এবং মনের উপাসনা। ‘লগোস’ শব্দটি জেনোর কাছে একটি ধর্মীয় রূপ লাভ করলেও মূলত ‘লগোস’ কথাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হেরাক্লিটাস। হেরাক্লিটাসের বিখ্যাত উক্তি, ‘একই নদীতে মানুষ দুইবার স্নান করতে পারে না।’ অর্থৎ বিশ্বজগৎ সদা পরিবর্তনশীল, এই মুহূর্তে যে আমি রয়েছি ঠিক পরের মুহূর্তের সেই আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই লেখার প্রতিটি শব্দ পড়ছেন আপনি কিন্তু হেরাক্লিটাসের মতে তা নয়, প্রতিটি শব্দ পড়ছেন ভিন্ন ভিন্ন আপনি এবং ভিন্ন ভিন্ন কম্পিউটারে। যেমন- সিনেমা হলের প্রজেক্টরে আলাদা আলাদা ছবি এসে একটি গতিশীল ঘটনার জন্ম দেয় ঠিক তেমন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষ কিংবা অন্যান্য বস্তু এদের মধ্যে এই সদা পরিবর্তন ঘটছে কেন? এর উত্তরেই হেরাক্লিটাস বলেন ‘লগোস’ এর কথা। আমাদের সবার অজ্ঞাতে এই লগোসই সব বস্তুর মাঝে পরিবর্তন ঘটাচ্ছে।
আসলে আমরা যদি একটু খেয়াল করি তাহলে দেখবো হেরাক্লিটাসের এই ‘লগোস’ বা আগের উল্লেখিত আনাক্সাগোরাসের নউস (প্রথম পর্ব দ্রষ্টব্য) অথবা প্রাচীন মিশরীয় দেবতা আটুমের (দ্বিতীয় পর্ব দ্রষ্টব্য) ধারণা খুব একটা ভিন্ন কিছু নয়। শুধু বলা যায় প্রাচীন মিশরের দেবতা আটুমের বর্ণনাকেই অনেকটা পরিবর্ধিত পরিসরে ব্যাখ্যা করে হেরাক্লিটাস তার নামকরণ করেন ‘লগোস’। পরবর্তীতে দার্শনিক ও গণিতবিদ জেনো লগোসকে বর্ণনা করেন এক চিরন্তন কারণ হিসেবে। যাকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতি রূপে।
লগোস বিশ্বজগতের চালিকাশক্তি যা প্রতিটি বস্তু এবং মানুষের মধ্যে প্রবাহমান। এভাবেই শুরু হয় পুরুষ এবং প্রকৃতি অথবা স্রষ্টা এবং সৃষ্টির যৌক্তিক ভিত্তিমূল। অনুসন্ধান শুরু হয় স্রষ্টা ও সৃষ্টির ঐক্য সাধনের, শুরু হয় লগোসের উপাসনা।
এদিকে আমরা যদি চাইনিজ তাওবাদ দেখি তাহলেও দেখবো প্রকট ও প্রচ্ছন্ন কারণ হিসেবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে দুটি কারণ ধরা হয় তা সেই স্রষ্টা-সৃষ্টিরই একটি ভিন্ন রূপ। এছাড়াও প্রাচীন ভারতের দিকে আমরা যদি নজর দেই তাহলেও আমরা দেখতে পাই পুরুষ-প্রকৃতি বা স্রষ্টা-সৃষ্টির মিলনের এক ভিন্ন আয়োজন, পুরুষ এবং প্রকৃতি রূপে ভেদের সঙ্গে এক অচিন্ত্য অভেদের সুতোয় গাঁথা কৃষ্ণ এবং রাঁধাকে। পার্থক্য শুধু ভক্তির পরিবর্তে ভালোবাসার মাধ্যমে পুরুষ প্রকৃতির উপাসনায়। তাই হয়তো মনসুর হাল্লাজের ‘আনাল হক’ আর শ্রী চৈতন্যের ‘মুই সেই’ একই অর্থ বহন করে। অথবা সক্রেটিসের ‘নো দাই সেলফ’ কেই লালনের মুখে শুনি ‘আপনারে আপনি চিনে নে’। আর এই স্রষ্টা সৃষ্টির ঐক্যই আমাদের আবহমান বাংলার ভাববাদী মন নিয়ে আমরা গেয়ে উঠি, ‘আমার মন তোরে পারলাম না বুঝাইতে রে, তুই সে আমার মন।’
চলবে…
মুহাম্মদ মামুন


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।
এ সম্পর্কিত অন্য লেখার লিংক-
তুই সে আমার মন- প্রথম কিস্তি
তুই সে আমার মন: দ্বিতীয় কিস্তি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

দ্বন্দ্বপূর্ণ আচরণ এবং আমাদের চিন্তার জগত

“বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকুরীতে ঢোকার পরপরই সিমির (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়ে যায়। ২বছরের একটি সন্তান আছে তাঁর। অন্তঃস্বত্বা হবার পরই চাকুরীটা ছেড়ে দেয়। ইদানিং সে...

মহামারীতে সম্পর্কে টানাপড়েন এড়াতে করণীয়

কোভিড-১৯এর এই দুঃসময়ে গুলোকে বেশ জটিল মনে হতে পারে। তবে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে পারলে মনের অমিল এবং সম্পর্কের এই জটিলতা গুলোকে বেশ সহজে...

সেক্সুয়াল মিথ ও যৌন স্বাস্থ্য: ২য় পর্ব

পর্নোগ্রাফীতে যে সহজতা থাকে, যে উত্তেজনার মাত্রা থাকে বাস্তব জীবনে তা থাকে না। কারণ অভিনয়ে বাড়াবাড়ি রকমের কিছু না থাকলে মানুষের মনে তা ধরে...

মহামারী কালে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে পারিবারিক বন্ধনের ভূমিকা

আমাদের কাছের মানুষ গুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক যত গভীর, বিপদ মোকাবেলায় আমাদের মানসিক শক্তি থাকবে ততোটাই বেশী। যে কোন বিপদ মোকাবেলায় পরিবার ও কাছের মানুষদের...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন