মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home মায়ের অসুস্থ ভালোবাসার ছায়া-১

মায়ের অসুস্থ ভালোবাসার ছায়া-১

ধরে নেয়া হয় পৃথিবীতে সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা সবচাইতে বেশী শর্তহীন ও নিটোল। যে মায়া মমতা ও ভালোবাসার আশ্রয় মায়ের কাছে সন্তান পায় তা সে আর কোথাও খুঁজে পায় না এবং তুলনাও করতে পারে না। মাতৃত্বের ছায়া এমন একটি বিষয় যা প্রতিটি মানুষ হয়তো এক বাক্যে স্বীকার করবে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হিসেবে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, একেবারে নিম্ন শ্রেণির মায়েদের পক্ষে সন্তানের প্রতি এই মায়া বা ভালোবাসার ঘাটতি হয়ে যায় দারিদ্র্যের কারণে এবং কঠিন বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করার কারণে। আবার অনেক স্বচ্ছলতার মাঝেও এই ঘাটতি খুঁজে পাওয়া যায়। আজ আমরা বিশেষ ধরনের মাতৃত্বের কথা ভাবব যেটা সুস্থ কিনা তা বিচার বিবেচনার দায়িত্ব পাঠকদের হাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।
শিশু যখন জন্ম নেয় তখন সে একেবারেই অসহায়। তার নিজের অবস্থা বুঝবার ক্ষমতাও তখন তার হয় না। এমতাবস্থায় মায়ের দায়িত্ব সার্বক্ষণিক যত্ন ভালোবাসা ও নিরাপত্তার মাধ্যমে তাকে বাড়তে দেয়া। মায়ের হাত ধরে বসা থেকে দাঁড়ানো, দাঁড়ানো থেকে হাঁটা এবং হাঁটা থেকে দৌড়ানো শেখে ছোট্ট অসহায় শিশু। শুয়োপোকা যেমন গুঁটির ভেতর চুপচাপ বসে থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে সুন্দর পাখা বিশিষ্ঠ প্রজাপতি হয়ে বের হয়ে আসে এবং ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায় মনের স্বাধীনতায়, ঠিক তেমনি একটি শিশুকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে গড়ার সময় ও সুযোগ দিতে হয়। যার ফলাফল সে তার স্বনির্ভরতা অর্জন করতে শেখে শারীরিক ও মানসিক দুই ভাবেই।
যদি এই নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও মা সন্তানকে শিশুই ভাবতে থাকেন, তার নিরাপত্তার খাতিরে সারাক্ষণ তাকে ঘিরে রাখেন তাহলেই সন্তানের বেড়ে উঠা বাঁধাগ্রস্থ হয়। সন্তান হাতে পায়ে এবং বয়সে বেড়ে উঠে ঠিকই কিন্তু বাড়ে না তার বিবেক, বুদ্ধি, সাহস, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, একা পথ চলার শক্তি এবং অন্যের সাথে অভিযোজনের দক্ষতা। মোট কথা পরিপক্কতা বলতে যা বুঝায় সেটি মায়ের সময় অতিরিক্ত আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে বাঁধাগ্রস্থ হয়।
এই অপরিপক্ক সন্তান যতদিন মায়ের ঘরে থাকে ততদিন জটিলতা খুব একটা হয় না, কেননা মা অতন্দ্র প্রহরীর মতো সবদিক থেকে তাকে ঘিরে রাখে। জটিলতার শুরু হয় যখন সে কোন সামাজিকতায় অংশগ্রহন করতে যায়। আবার যখন এই অপরিপক্ক সন্তানকে মা বিয়ে দেন (বিশেষ করে মেয়ে সন্তানকে) তখনই দেখা যায় মেয়েটি স্বামীর সাথে মানিয়ে চলতে পারছে না। পারার কথাও নয়, কেননা এই মা তার মেয়েকে শুধু তার মায়ের সাথেই চলতে শিখিয়েছেন। তিনি একাই মেয়েটির মা, বন্ধু, আত্মীয়, অভিভাবক, আশ্রয়দাতা, অন্নদাতা সবকিছু হয়ে বসে ছিলেন। মেয়েটিকে কারো সাথে চলার দক্ষতা অর্জন করতে তিনি দেন নি। আবার দাম্পত্য জীবনে মেয়েটি যখন মানিয়ে চলতে পারে না তখনও তিনি মেয়েটির আশ্রয়দাতা হয়ে থাকেন এবং স্বামীর দোষ মনে করেন। হয়তো কোন কোন ক্ষেত্রে স্বামীর সাথে মেয়ের সম্পর্ক ভালো হোক তিনি তা চানই না।
এই ‘মা’ এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা বা একাকীত্বের কারণে মেয়ের উপর তার অতি ভালোবাসার জাল ফেলে রাখেন। মেয়ে যদি স্বামীকে নিয়ে খুশি থাকে তবে মায়ের আর প্রয়োজন থাকেবেনা, এধরনের ভীতি তার মনের মধ্যে বসবাস করে। মেয়ে সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে পারলে তিনি (মা) একা হয়ে যাবেন, “তখন আমি বাঁচবো কি নিয়ে?” এধরনের অসুস্থ চিন্তাগুলো অসুস্থ মাতৃত্বের কারণে টিকে থাকে। নিজের মেয়েকে তিনি কোন ভাবেই বেড়ে উঠতে অর্থাৎ ম্যাচিউর্ড/পরিপক্ক হতে দেন না, সব দিক থেকে মায়ের উপর নির্ভরশীল বানিয়ে রাখেন, যাতে মেয়ে মাকে ছাড়া চলতেই না পারে। তাহলে তিনি মেয়ের প্রয়োজনের মধ্যেই বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পান, সুখী বোধ করেন। কিন্তু তাঁর এই অসুস্থ মাতৃত্বের ছায়ায় তিনি তাঁর মেয়েকে কতখানি পঙ্গু বানিয়ে ফেললেন তা বুঝতে তিনি নারাজ। মাতৃত্বের ভয়াল ক্ষুধা তাকে এধরনের প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করে। ফলাফলে দেখা যায় তাঁর মেয়েও এক ধরনের অচল পয়সার মতোই বেড়ে উঠে এবং সমাজে সমস্যার সৃষ্টি করে। স্বামীর সংসারও সে ঠিকমতো করতে পারে না আবার বাবা-মায়ের সংসারে যখন বাইরের কোন সদস্যের আগমণ ঘটে (যেমন- ভাইয়ের বউ) তার সাথে তার ঝামেলা লাগতে থাকে। মেয়ে স্বামীর সাথে যাই হোক না কেন মা’কে সে যায়গায় নাক গলাতেই হবে। অন্যদিকে স্বামী বেচারা পড়ে মহা সমস্যায়, স্ত্রী তার মায়ের কথা ছাড়া কোন কিছু করে না, বুঝে না, মানতে চায় না। সবকিছুতেই সে তার স্ত্রীর মাঝে শ্বাশুড়ীর অস্তিত্ব খুঁজে পান। শ্বাশুড়ীকে অতিক্রম করে স্ত্রীকে পাওয়া তার জন্য এক ধরনের যুদ্ধের মতো অনুভব হতে থাকে। অতি আদরের ছলে মা তার মেয়েকে সংসারের কোন কাজও শেখায়নি আবার অন্যের দায়িত্ব পালনও করতে দেননি। তাই স্বামীর স্ত্রীর হাতে এক কাপ চা খাওয়ার বাসনা পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিতে হয়। স্ত্রীর কাছে সেবাযত্ন পাওয়ার ইচ্ছাও তার হারিয়ে যায়। এধরনের স্বামীরা বিয়ে করে ভাবতে থাকে বউয়ের সাথে সাথে একজন শ্বাশুড়ীকেও তার হজম করতে হচ্ছে। এর শেষ কোথায় এবং কবে?
এ ধরনের মা চেষ্টা করেন মেয়ের জন্য ঘর জামাই খুঁজে বের করতে। যদি না পান তবে বিয়ের পর বিভিন্ন ছুতায় মেয়েকে নিজের কাছেই রেখে দেন যাতে জামাই বাধ্য হয় শ্বশুড় বাড়ী থাকতে। এমনকি জামাই শ্বশুড় বাড়ী না থাকলেও সমস্যা নেই, মেয়ে কাছে থাকলেই হলো। যেহেতু মেয়েটির বিবেক বিবেচনা মা তৈরী হতে দেননি তাই মেয়েটিও বুঝতে পারেনা তার আসল ঠিকানা কোনটি, তার স্বামীর সংসারে প্রয়োজনীয়তা কোথায়। এমন কি সে এটুকুও বুঝতে নারাজ যে মা চিরকাল থাকবে না, তখন আমি কি করব? যেহেতু তার সংসার করার দক্ষতাগুলো মা তৈরী হতে দেননি সে কারণে সংসারের প্রতি তার এক ধরনের বিমুখতাও থাকে। মা’র সাথে থাকলে দুনিয়ার কোন সমস্যাই তাকে ছুঁতে পারে না, তাহলে অযথা স্বামীর সংসারের ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কি!
এই মা দেখা যায় মেয়েকে যেদিন পৃথিবীতে এনেছেন সেদিন থেকেই মেয়েকে যেন পৃথিবীর কোন সমস্যা, দুঃশ্চিন্তা, কষ্ট ছুঁতে না পারে সেই প্রতিজ্ঞা করে বসেছেন। সাধারণ জীবনে কোন দুঃখজনক ঘটনা, কোন অতৃপ্তি অথবা কোন অসহায়ত্ব থেকে এ ধরনের অসুস্থ মাতৃত্ববোধ জন্ম নেয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মেয়ের উপর মায়ের এই অচ্ছেদ্য সম্পর্কের মায়াজালকে বলা হয়- Sick Bonding. এই অসুস্থ সম্পর্কের বলয়ের ভেতর কেউ ঢুকতে পারে না বা ঢুকতে দেয়না এই মা বা মেয়ে দুজনের কেউই। ফলে সমস্যায় পড়ে এদের আশেপাশের মানুষ।
লেখক
তামিমা তানজিন
কনসাল্ট্যান্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট
প্রত্যয় মেডিকেল ক্লিনিক


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

আশাবাদী মনোভাব দীর্ঘায়ু প্রদান করে

আশাবাদী মনোভাব মানুষকে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগায়। অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও মনের জোর বজায় রাখে। বিপদে ধৈর্য প্রদান করে। সম্প্রতি গবেষকগণ এই দাবি করেছেন যে একজন আশাবাদী...

কারো সাথে ঠিকমতো কথা বলতে পারি না

সমস্যা: আমার বয়স ২৭ বছর। আমি ফ্রিল্যান্সিং কাজের সাথে যুক্ত আছি। আমি খুবই কনজারভেটিভ ফ্যামিলিতে বড় হয়েছি। বর্তমানে আমার কিছু সমস্যা হচ্ছে। কারো সাথে...

করোনা মহামারি ও নয়া স্বাভাবিকতা নিয়ে মনের খবর অক্টোবর সংখ্যা প্রকাশিত

দেশের অন্যতম বহুল পঠিত মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন মনের খবর এর অক্টোবর সংখ্যা। অন্যান্য সংখ্যার মত এবারের সংখ্যাটিও একটি বিশেষ বিষয়ের উপর প্রাধান্য...

ধর্ম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র

অনেকেই মনে করেন ধর্মীয় বিধি বিধান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মাঝে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং বিশেষ করে যারা ধর্মীয় জীবন যাপন করেন তারা উন্নত...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন