মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home তুই সে আমার মন- প্রথম কিস্তি

তুই সে আমার মন- প্রথম কিস্তি

শিরোনামটা দেখেই মনে হতে পারে একেবারে বাংলা চলচ্চিত্রের চিরায়ত সেই রাজপুত্র আর বেদেনী কন্যার প্রেম অথবা গরীব চাষার ছেলের সঙ্গে চৌধুরী সাহেবের কন্যার অসম ভালোবাসার গল্প। এখনি যেনো নায়ক সাহেব বলে উঠবেন, ‘চৌধুরী সাহেব, ধন দিয়ে মন বোঝার চেষ্টা করবেন না’।

ঠিক আছে, নায়কের কথা না হয় মেনেই নিলাম, কিন্তু কথা হচ্ছে মনকে বুঝব কি করে? নায়ক-নায়িকার মতো অসম ভালোবাসা আর তা নিয়ে খলনায়কের সঙ্গে যুদ্ধ করে? আসলেই তো, মন নিয়ে মানুষের মনোচিন্তনের অন্ত নেই! মন দেয়া নেয়া থেকে শুরু করে মনোজ্বালা কি নেই এর ভেতর!

আরো আছে, লালন সাঁই এর মনের মানুষ, রবি ঠাকুরের জীবন দেবতা বা শ্রী চৈতন্যের মুই সেই। লালন দর্শনই হোক বা চৈতন্য দর্শনই হোক বা হোক অন্য কোনো ভাববাদী দর্শন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেহ আর মনকে আলাদা দুটি সত্তা ধরেই গতি পায় তাদের আলোচনা। আবার এদের আলোচনার মধ্যে বৈপরীত্য বা মনোমালিন্যও কিন্তু কম নয়।

You are my heart

প্রাচীন ভারতীয় চার্বাক সম্প্রদায় তো বলেই গেছেন, আরে সব ঝুঁট হ্যাঁয়, এ পৃথিবীর জড় পদার্থ দিয়েই আমাদের দেহভাণ্ড গঠিত, শরীরের যা কিছু আছে তা এ ধরণীর মাটি-পানি-বাতাস দিয়েই গঠিত। যার সব কিছুই জড়।

জড় পদার্থের যেমন মন বলে আলাদা কিছু নেই, তেমনি আমাদের শরীরের ভেতরেও মন বলে কিছু নেই। লোকে বলে, বটে! বলো দেখি জড় পদার্থের তো মন নেই তাহলে জড় দিয়ে গঠিত দেহে ‘মন’ নামক যে চেতনা সেটা আসলে কি করে? চার্বাকরা বলে, বলছি! তার আগে বলো দেখি বাপু তুমি কি পান খাও? পান-চুন-সুপারি কোনোটাতেই তো লাল রঙ নেই, তবে পান চিবুলে লাল রঙ আসে কোথা থেকে? তা বাপু তিনটি ভিন্ন দ্রব্য মিশে যদি আলাদা রঙ আনতে পারে তাহলে মাটি-পানি-বায়ু একটি সুষম মিশ্রণে চেতনা কেন আনতে পারবে না!

তা সে যাই হোক, চার্বাকরা আমাদের যতোই কথার মারপ্যাঁচে ফেলুক, ভোলা সহজে ভোলে না।

প্লেটো বা তলস্তয়রা তো আর বসে থাকবেন না। মনোবিশ্লেষণের যাত্রা যে সাহিত্যিক- দার্শনিকদের হাত ধরেই শুরু, চার্বাকদের কথা শুনলে হবে কেন! এদিকে সুদূর গ্রীস দেশে বসে জ্ঞান সাধনা করছেন আধুনিক বিজ্ঞানের জনক থেলিস। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে তিনি মনের কথা কিছু বললেন না, শুধু বললেন এ জগতে যা কিছু আছে তার সবই পানি নামক বস্তু থেকে তৈরি। দুর্জনেরা বললেন, বটে! দ্বীপ দেশের বাসিন্দা ( ভুমধ্য সাগরের আইয়োনিও অঞ্চল) বাপু তুমি, চারদিকে পানি দেখতে পাও তাই বলছো সবই পানি থেকে এসেছে। কিন্তু আমরা সেটা মেনে নিলাম না।

তাই দার্শনিক আনাক্সিমিনিস এসে বললেন, পানি নয় ধরার এই বাতাসই হচ্ছে সৃষ্টির মূল উপাদান, এম্পিডক্লিস বললেন আগুনের কথা আর হেরাক্লিটাস এসে কাউকে হতাশ না করে বলে দিলেন মাটি, পানি, আগুন ও বাতাস এই চারটিই হচ্ছে জগৎ সৃষ্টির মূল উপাদান। যা আমরা আবার দেখতে পাই প্রাচীন ভারতের চার্বাকদের জগৎ ও দেহ সৃষ্টির চারটি মূল উপাদান ক্ষিতি(মাটি), অপ(জল), তেজ(আগুণ) এবং মরুৎ(বাতাস) হিসেবে। পার্থক্য শুধু হেরাক্লিটাস যেখানে উপাদানগুলোর আকর্ষণ বিকর্ষণের কথা বলেছেন চার্বাকরা সেখানে বলেছেন উপাদানগুলোর মিশ্রণের কথা।

ডেমোক্রিটাস এসে দৃশ্যমান সব নামসর্বস্ব বস্তুকে বাতিল করে এমন এক ক্ষুদ্রতম কণার ধারণা দিলেন যা সর্বদা গতিশীল এবং সেই দেখার অযোগ্য ক্ষুদ্রতম কণার বহুমাত্রিক গতিশীলতাই এই জগৎ সৃষ্টির কারণ। আধুনিক বিজ্ঞানে সে ক্ষুদ্রতম কণাই আজ পরমাণু নামে পরিচিত।

যাই হোক, আমরা খুঁজতে বেড়িয়েছি মনকে, জগৎ সৃষ্টির মূল উপাদান যেটাই হোক, বিভিন্ন মতবাদ নিয়ে বাদানুবাদ যতোই হোক সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। কারণ এদিকে আমাদের চলচ্চিত্রের নায়কের মতো করেই আনাক্সাগোরাস বলে বসলেন, ‘থেলিস সাহেব, শুধু দৃশ্যমান জগৎ দিয়েই সৃষ্টির ব্যাখ্যা দেবেন না।’ তাঁর মতে জগতের সৃষ্টি ঠিকই বস্তু দ্বারা হয়েছে কিন্তু বস্তু নামক জিনিসগুলো জগৎ সৃষ্টি করলো কেন? তারা যেমন ছিল তেমনই থাকলেই বা ক্ষতি কী ছিল? কেনই বা তারা তাদের নিজেদের মতো থাকতে না পেরে এভাবে বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে ফুল, গাছ-পালা, পাহাড়-নদী, মানুষ, পশু-পাখি এতো এতো কিছুতে পরিণত হলো?

অ্যানাক্সাগোরাস বলেন, নিশ্চল জড় পদার্থের কোনো গতি শক্তি নেই, আলাদা একটি সচেতন গতিশীল শক্তির কারণে তারা সুশৃঙ্খল ও সুন্দর ভাবে এ জগৎ সৃষ্টি করেছে। এই ভিন্ন অদৃশ্য শক্তির নাম দিলেন তিনি ‘Nous’, যার বাংলা করলে আমরা ভাবগত ভাবে বলতে পারি চেতনা বা সচেতন সত্তা যা বস্তু বা পরমাণুর মধ্যে প্রবেশ করে তাকে গতিশীল করে। আর সেটাই মনের আদি রূপ। জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোচনায় এটাই মনের চলার পথের প্রথম পদক্ষেপ।

তবে দুঃখজনক দিক হলো আনাক্সাগোরাস ‘Nous’ এর কথা বলে গেলেও এই Nous ব্যাপারটা কী, কেন, কোথায়, কিভাবে এলো এর কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে যান নি। পরবর্তীতে সক্রেটিস আনাক্সাগোরাসের তত্ত্ব গ্রহণ করেন।

সক্রেটিস বলেন, বাহ্যিক জগৎ দেখা বা অনুভব করার জন্য প্রয়োজন বিশ্লেষণী শক্তি এবং বিচক্ষণতা যা আমরা অর্জন করি জ্ঞানের মাধ্যমে। এই জ্ঞানই হচ্ছে জীব জগতের প্রকৃত ধর্ম। এভাবেই পশ্চিমা দুনিয়ায় শুরু হলো দেহের সঙ্গে মনের পৃথকীকরণ।

পরবর্তীতে সক্রেটিসের সুযোগ্য ছাত্র প্লেটো তাঁর শিক্ষাগুরুর তত্ত্বকে গ্রহণ করে লিখে ফেলেন তাঁর অন্যতম বিখ্যাত রচনা ‘Allegory of the Cave’। আর এই বইয়ের মাধ্যমে ‘Idea’ বা ‘ধারণা তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই পাশ্চ্যাত্য দর্শনে ‘ভাববাদ’ নামে দর্শনের আলাদা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং জন্ম হয় দেহ ও মনকে আলাদা করে আলোচনার প্রয়াস।

মুহাম্মদ মামুন


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

Most Popular

মানসিক চাপে ত্বকের ক্ষতি

মানসিক চাপের বহু ক্ষতিকর দিক রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ত্বকের ক্ষতি। এ ছাড়াও উচ্চমাত্রার মানসিক চাপের ফলে চুল পড়া, তৈলাক্ত মাথার ত্বক, অতিরিক্ত ঘাম...

পর্নোগ্রাফির আসক্তি যেভাবে প্রভাবিত করে ব্যক্তির চিন্তা

পর্নোগ্রাফির আসক্তি মানুষের জীবনে নানারকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বদলে দেয় মানুষের চিন্তা ধারা। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে শিশুদের নিয়ে কাজ করে এরকম একটি দাতব্য সংস্থা প্ল্যান ইউকে...

কাকে বিশ্বাস করবেন? বিশ্বাস-অবিশ্বাসের পেছনের মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি

যখন মনের জোর ধীরে ধীরে কমতে থাকে, তখন উদ্বেগ এবং আশঙ্কা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এতে করে মানুষ যেমন নিজের উপর বিশ্বাস ফারিয়ে ফেলে,...

মৃত্যুভয় কাজ করে এবং সারাক্ষণ কল্পনার ভেতর ডুবে থাকি

সমস্যা: আমি কুমিল্লা থেকে মোঃ বেলাল হোসেন বলছি। আমি যেকোনো কিছু কল্পনা করতে ভালোবাসি, কল্পনার ভেতরই ডুবে থাকি সারাক্ষণ। মাথায় নানা রকম চিন্তা আসে...

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন