শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য দুটিই আমাদের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অর্থাৎ, শারীরিক সমস্যা মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে এবং একইভাবে, মানসিক অস্থিরতা শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। স্বাস্থ্য বলতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক স্বস্থ্যকেই বুঝানো হয়। শারীরিক সুস্থতাকে সুস্বাস্থ্য এবং শারীরিক অসুবিধা বা সমস্যাকে অসুস্থতা বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বস্থ্য হলো এমন অবস্থা যেখানে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক এই তিনটির সুস্থ সমন্বয়কে বোঝায়। মানসিক স্বাস্থ্য হলো ব্যক্তির ভাবনা, অনুভূতি এবং জীবনের বিভিন্ন অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে চলা। এটা মানুষের চাপ মোকাবেলা করতে, অন্যের তুলনা করতে এবং নিজের পছন্দ বেছে নিতে সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্য ব্যক্তির ভাল থাকার একটি অবস্থা যার মাধ্যমে সে নিজের সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে পারে, জীবনের স্বাভাবিক চাপ মোকাবেলা করতে পারে, ফলপ্রসূভাবে কাজ করতে পারে এবং তার নিজের সমাজে অবদান রাখতে পারে।
যাদের শারীরিক অসুস্থতা আছে তাদের মধ্যে সবাই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অনুভব করবে না। দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক অসুস্থতাযুক্ত ব্যক্তিদের মানসিক সুস্থতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শারীরিক সমস্যা কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে:
গবেষণায় মানসিক অসুস্থতা এবং নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে একটি যোগসূত্র দেখানো হয়েছে যেমন:
- ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হাঁপানি, উচ্চ রক্তচাপ, মৃগীরোগ। শুধুমাত্র এই শারীরিক অসুস্থতাগুলোই যে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে তা নয়। যাদের শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তাদের শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো থাকা লোকজনের তুলনায় ২ থেকে ৩ গুণ বেশি মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- ব্যাথা: দীর্ঘ ব্যথা মানুষকে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের শিকার করে তুলতে পারে।
- শারীরিক পরিবর্তন: বয়স বা রোগের কারণে শারীরিক পরিবর্তন মানুষের আত্মসম্মানকে ক্ষুণ্ন করে তুলতে পারে।
- চিকিৎসা: কিছু চিকিৎসা পদ্ধতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
মানসিক অস্থিরতা শারীরিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। যেমন :
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া: মানসিক চাপ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে, ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
- শারীরিক উপসর্গ: বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ হিসাবে মাথাব্যথা, পেট খারাপ, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
- অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: মানসিক অস্থিরতা মানুষকে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান বা মদ্যপানের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য কীভাবে সংযুক্ত: শারীরিক এবং মানসিক রোগগুলো কীভাবে সম্পর্কিত তা সবসময় বোঝা যায়না। মানুষের বৈশিষ্ট্য এবং তার কি ধরনের শারীরিক বা মানসিক রোগ আছে তার উপর নির্ভর করে। যেমন:
- শারীরিক অসুস্থতা মানসিক অসুস্থতা তৈরি করতে পারে।
- শারীরিক অসুস্থতা মানসিক অসুস্থতার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।
- শারীরিক অসুস্থতা এবং মানসিক অসুস্থতা পরস্পর সম্পর্কিত না হয়েও একই সময়ে হতে পারে।

কিছু জিনিস সরাসরি কারো মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটানোয় অবদান রাখতে পারে, যার মধ্যে আছে:
- মানসিক চাপ – একটা শারীরিক অসুস্থতা খুব খারাপ হতে পারে, এবং তা মানসিক স্বাস্থ্যকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
- *ওষুধের চিকিৎসা – কিছু ওষুধের চিকিৎসা মস্তিষ্কের কাজ করার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্টেরয়েড মেজাজ পরিবর্তন এবং মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণগুলোর কারণ হিসেবে ধরা হয়। মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণগুলোর মধ্যে আছে: সত্য নয় এমন জিনিস বিশ্বাস করা, স্পষ্টভাবে চিন্তা করায় অসুবিধা হওয়া, বাস্তবে নেই এমন কিছু অনুভব করা ইত্যাদি।
- *শারীরিক অসুস্থতা – কিছু শারীরিক অসুস্থতা মস্তিষ্কের কাজ করার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, যাদের থাইরয়েড (হাইপোথাইরয়েডিজম) আছে তাদের মানসিক অবসাদ এবং উদ্বেগে ভোগার সম্ভাবনা বেশি।
- শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি যদি:
- *কারও আগেও একটা মানসিক অসুস্থতা ধরা পড়ে।
- *কারও কোন পরিবার বা বন্ধু নেই যাদের সাথে তিনি নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে কথা বলতে পারেন।
- *কারও জীবনে একই সময়ে অন্যান্য সমস্যা বা চাপ আছে। উদাহরণস্বরূপ চাকরি হারানো, বিবাহবিচ্ছেদ, বা প্রিয়জনের মৃত্যু। কখনও কখনও ইতিবাচক জীবন পরিবর্তনও মানসিক স্বাস্থ্যকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে যদি সেগুলো অপ্রত্যাশিত বা মানসিক চাপযুক্ত হয়।
- *কারও একটা কঠিন প্রাণঘাতী রোগ থাকে।

যে সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য সবচেয়ে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তা হলো:
- *যখন আপনাকে প্রথম আপনার অসুস্থতার কথা জানানো হয়।
- *বড় অস্ত্রোপচারের পরে বা আপনার চিকিৎসার পর অস্বস্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে।
- *যদি আপনি ভালো বোধ করার পরে আবার অসুস্থতা ফিরে আসে। যেমন ক্যান্সার ফিরে আসা বা দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক হওয়া।
- *যদি আপনার অসুস্থতা চিকিৎসায় ভালো না হয়।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করার উপায় :
- * সুষম খাদ্য: পুষ্টিকর খাবার শরীর ও মন দুটোকেই সুস্থ রাখে।
- * নিয়মিত ব্যায়াম: ব্যায়াম শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মেজাজকে ভালো রাখতে সাহায্য করে।
- * পর্যাপ্ত ঘুম: ভালো ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- * ধ্যান ও যোগব্যায়াম: এইগুলি মানসিক চাপ কমাতে এবং শরীর ও মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
- * সামাজিক যোগাযোগ: পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
- * চিকিৎসা: যদি কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মনে রাখবেন: শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য দুটিই একে অপরের পরিপূরক। একটির যত্ন না নিলে অন্যটিও প্রভাবিত হবে। তাই সুস্থ থাকতে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য দুটির সমান যত্ন নিন।
অনেকের জিজ্ঞাসা থাকে শারীরিক অসুস্থতার জন্য ওষুধ সেবন করি তবে আমি কি মানসিক অসুস্থতার জন্য ওষুধ খেতে পারবো?এর উত্তর হলো : আপনার যদি শারীরিক অসুস্থতা থাকে, তাহলে আপনি হয়তো ইতিমধ্যেই ওষুধ সেবন করছেন। আপনার ডাক্তার আপনাকে জানাবেন যে কোন ওষুধগুলো একসাথে খাওয়া উচিত নয়। তারা আপনাকে এটাও জানাবে যে কোন ওষুধে কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে যা আপনার খেয়াল রাখা উচিত। তবে এটা অবশ্যই জানা উচিত যে শারীরিক ও মানসিক দুইটা রোগের ওষুধই পাশাপাশি খাওয়া যায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী। সব ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, যদিও এগুলো সাধারণত হালকা হয় এবং যখন কিছু সময় ধরে ওষুধ সেবন করা হয় তখন এগুলো আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়। যে কোনো শারীরিক বা মানসিক পরিবর্তন ডাক্তারের সাথে শেয়ার করা উচিত। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে, মানসিক রোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষই উৎপাদনশীল এবং পরিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে যদি সময়মত চিকিৎসা নেয়। কাজেই রোগ হলে অবশ্যই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং চিকিৎসা নিতে হবে।
ডা. ফাতেমা জোহরা
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মানসিক রোগ বিভাগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
সিরিয়ালের জন্য ভিজিট করুন- এপোয়েন্টমেন্ট
আরও দেখুন-


