ভালো থাকার জন্য নিয়ম মেনে চলি-ফরিদা পারভীন

0
26

কিংবদন্তিতুল্য সংগীত শিল্পী তিনি। বিশেষ করে লালন শিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি আকাশছোঁয়া। সঙ্গীতময় কর্মজীবনে তিনি গেয়েছেন লোকগান, আধনিক, দেশাত্মবোধকসহ অসংখ্য গান। পেয়েছেন ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচারাল প্রাইজ, রাষ্ট্রীয় একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পরস্কারসহ দেশে-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। তিনি ফরিদা পারভীন। মনের খবর পাঠকদের তিনি জানিয়েছিলেন তাঁর মনের কথা, ভালোলাগার কথা, স্বপ্নের কথা, পরিকল্পনার কথা, জীবন দর্শনের কথা। মনের খবর অনলাইন পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল এই মহাতারকার মনের কথাগুলো। তাঁর সাথে কথা বলেছেন মুহাম্মদ মামুন

 

মনের খবর: কেমন আছেন?
ফরিদা পারভীন: আল্লাহর রহমতে ভালো আছি।

মনের খবর: ভালো থাকার জন্য কী করেন?
ফরিদা পারভীন: ভালো থাকার জন্য একটু নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলাফেরা করি। যেহেতু নিয়ন্ত্রণহীনতা বিপর্যয় ঘটায়, সেহেতু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকে লোভ-লালসা থেকে একটু পরিশুদ্ধতা লাভের চেষ্টা করি।

মনের খবর: মন খারাপ হয়?
ফরিদা পারভীন: হ্যাঁ, মন খারাপ হয়।

মনের খবর: মন খারাপ হলে কী করেন?
ফরিদা পারভীন: মন খারাপের ব্যাপারটা একদিক থেকে ভালো, এতে পরমেশ্বরের সান্নিধ্য লাভে একনিষ্ঠ হওয়া যায়। আর যেহেতু আমি সংগীত শিল্পী, লালনের গান করি, সঙ্গীতের জন্য কষ্টটা খুব দরকার।

মনের খবর: কেন?
ফরিদা পারভীন: কারণ সঙ্গীতের অন্তর্নিহিত বেদনাটা এবং যিনি গান করেন তার বেদনাটা যদি মিলে যায়, তাহলে যিনি গান করেন বা যারা গান শোনেন তাদের হৃদয় উপশম হয়।

মনের খবর: লালন শিল্পী হয়ে ওঠার ইচ্ছেটা কীভাবে এলো?
ফরিদা পারভীন: লালন শিল্পী হয়ে ওঠার ইচ্ছে আমার ছিল না। আমার যে সংগীতগুরু মোকসেদ আলী সাঁই, উনি স্বাধীনতার পর এক লালন উৎসবে আমাকে গাইতে বললেন। স্টেজে আমার প্রথম লালনের গান ‘সত্য বল সপথে চল ওরে আমার মন’ গাইলাম। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে লালনের গানের প্রতি ভালোলাগা তৈরি হলো।

মনের খবর: রাগ হয়?
ফরিদা পারভীন: হ্যাঁ হয়। হয়তো বড় কারণে অনেক সময় রাগ হয় না কিন্তু ছোট ছোট কারণে রাগ হয়ে যায়।

মনের খবর: রাগ হলে কী করেন?
ফরিদা পারভীন: রাগ হলে অভিমানটা বেড়ে যায়। এমন অনেক রাগ আছে মনে হয় যার ওপর রাগ হলো তার সঙ্গে আর বেশি সময় সম্পর্ক রাখব না। রাগ হলে দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টে যায়।

মনের খবর: রাগ নিয়ন্ত্রণ করেন কীভাবে?
ফরিদা পারভীন: রাগ হলে সচরাচর সেটা কাউকে বুঝতে দিতে চাই না, তারপরও অনেক সময় অবয়ব দেখে অনেকে বঝতে পারে, কোনো কারণে আমি মনক্ষুণ্ণ আছি।

মনের খবর: রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন জিনিসটা সবচেয়ে জরুরি?
ফরিদা পারভীন: রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটু ধৈর্যশীল হতে হবে। সাঁইজি তাঁর কথার মধ্যেও রাগ নিয়ন্ত্রণের কথা বলে গেছেন, আবার আমরা যারা মুসলমান তাদের ধর্মীয় গ্রন্থেও মানুষকে ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে।

মনের খবর: হিংসা আছে?
ফরিদা পারভীন: আছে।

মনের খবর: হিংসাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ফরিদা পারভীন: হিংসাটা যদি ভালো কাজে বা ভালো উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে সেটি বরং ভালো। যেমন সে একটা ভালো কাজ করছে আমি কেন করছি না। এমন একটা মনোভাব সবার জন্যই ভালো।

মনের খবর: স্মৃতিকাতরতা আছে?
ফরিদা পারভীন: প্রত্যেকটা মুহুর্তই তো মানুষের স্মৃতি। এরপর একদিন অনন্তকালের কাছে চলে যেতে হবে, দুনিয়ার যা কিছু স্মৃতি সব নীরবে নিরাঞ্জন হবে, অর্থাৎ সব স্মৃতি পানিতে মিশে যাবে। তাই এ স্মৃতি মূল্যহীন। সেজন্যই সাঁইজি বলেছেন, ‘গুণে পড়ে সারলি দফা করলি রফা গোলেমালে। ভাবলিনে মন কোথা সে ধন ভাজলি বেগুন পরের তেলে।।’

মনের খবর: কোন স্মৃতি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়?
ফরিদা পারভীন: সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগে মঞ্চে গান গাওয়ার স্মৃতিগুলো। গান গেয়ে যখন দর্শক-শ্রোতাদের ভালোবাসা পাই বা আমার গাইতে ভালো লাগে। আর ওই মুহূর্তগুলোর স্মৃতি আমাকে অনেক বেশি আনন্দ দেয়। আবার কখনো উল্টোটাও হয়, কখনো হয়তো আমি গান গাওয়ার মুড পাচ্ছি না বা গান গাইতে গিয়ে নিজের কাছে নিজে আমি হোঁচট খাচ্ছি। শ্রোতারা হয়তো সেটি বুঝতে পারছে না কিন্তু নিজের কাছে নিজের এই যে হোঁচট খাওয়া সেটি আমাকে কষ্ট দেয় অনেকদিন।

মনের খবর: স্বপ্ন  দেখেন?
ফরিদা পারভীন: স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি আমার ফাউন্ডেশন নিয়ে, আমার চিন্তা নিয়ে, আমার সঙ্গীতের প্রতিষ্ঠান ‘অচিন পাখি’ নিয়ে।

মনের খবর: কেমন সে স্বপ্নগুলো?
ফরিদা পারভীন: স্বপ্ন আছে আমার ফাউন্ডেশন দিয়ে লোকগানের জন্য কাজ করা। স্বপ্ন আছে ‘অচিন পাখি’ শিক্ষালয়ের মাধ্যমে ছেলে-মেয়েদের গান শেখানো বা ছবি আঁকা শেখার কাজকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

মনের খবর: বাংলা লোকগান নিয়ে আপনার পরিকল্পনাগুলো কী?
ফরিদা পারভীন: লোকগানের যেহেতু স্বরলিপি হয় না, তাই লোকগানগুলো সবসময় পরিবর্তনশীল। আমি আমার গুরুর থেকে সংগীতের যে তালিম পেয়েছি, সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছা আছে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, ‘ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে একটি লালন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে লোকগানের গবেষণা হবে। লোকগানের যে যন্ত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে সংরক্ষণ করা হবে। আগামী প্রজন্ম যাতে দেখে বোঝে, এটিই আমাদের শেকড়। এটিই আমাদের পরিচয় বহন করে। আগামীর প্রজন্ম যাতে দেখতে পারে, বঝতে পারে, অনেক অনেক জাতির চেয়ে আমাদের ঐহিত্য অনেক অনেক সমৃদ্ধ। এখানে লালন ফকির আছেন, হাছন রাজা আছেন, রাধারমণ দত্ত আছেন, উকিল মুন্সী আছেন, দুদু শাহ্ আছেন, জালাল খাঁসহ আরো অনেক অনেক মরমী কবি যে দেশে রয়েছেন, সে দেশের সংস্কৃতি অনেক অনেক সমৃদ্ধ।

মনের খবর: ব্যক্তি জীবনে আপনার মধ্যে চাওয়া- পাওয়ার দুরত্ব কতটুকু?
ফরিদা পারভীন: চাওয়ার চেয়ে পেয়েছি অনেক বেশি। এক সময় চাওয়া ছিল শুধু রেডিওতে গান গাইতে পারার। এরপর একে একে টেলিভিশন, গানের অ্যালবাম, বিভিন্ন দেশে বাংলা লোকগানের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ। দেশে- বিদেশে পুরস্কার ও সম্মাননা, মানুষের ভালোবাসা। পরিশেষে আল্লাহর অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছু সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন অনেক।

মনের খবর: সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলন।
ফরিদা পারভীন: পাঠকদের উদ্দেশে লালন সাঁই-এর বলা দুটি কথা বলব শুুধু। এক, সময় গেলে সাধন হবে না। দুই, সত্য বল সপথে চল। সময় থাকতে সবাই সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। সুন্দর জিনিসগুলোকে গ্রহণ করে সত্য ও সুপথে চলার বাসনা তৈরি করুক সবাই। আমাদের এই বাংলা ভাষায় অনেক অনেক সুন্দর উপাত্ত রয়েছে। সুন্দর গল্প-কবিতা-গান রয়েছে, সেগুলো তারা গ্রহণ করুক এবং অসুন্দরকে প্রত্যাখ্যান করুক।

মনের খবর: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
ফরিদা পারভীন: ধন্যবাদ আপনাকেও।

[মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন- ১ম বর্ষ, ৫ম সংখ্যা থেকে নেওয়া]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here