মানসিক স্বাস্থ্যের সবকিছু ENGLISH

Home মনস্তত্ত্ব. তারকার মন ‘‘মনে ভালোবাসার বৃক্ষ রোপন করতে হবে’’ - নাসির আলী মামুন

‘‘মনে ভালোবাসার বৃক্ষ রোপন করতে হবে’’ – নাসির আলী মামুন

নাসির আলী মামুন। ‘ক্যামেরার কবি’ হিসেবে পরিচিত এই আলোকচিত্রী। পোর্ট্রেট ছবির ধারা বাংলাদেশে তার হাত ধরেই যাত্রা শুরু করেছে। দেশ তো বটেই, তুলেছেন বিশ্বের নানা দেশের বিশিষ্টজনদের ছবি। আলোকচিত্র ছাড়াও রয়েছে তার কিছু সাক্ষাৎকার ও আলোকচিত্র বিষয়ক গ্রন্থ। সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠিত হয়েছে তাঁর একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। জাদুঘরের গ্যালারিতে বসেই কথা হয়েছে তার সাথে। তিনি বলেছেন তার ক্যামেরা, জীবনযাপন ও মনের নানা দিক নিয়ে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মামুন মিজানুর রহমান।

মনের খবর: ভালো আছেন?
নাসির আলী মামুন: জ্বী, ভালোই আছি।

মনের খবর: নিজেকে কীভাবে ভালো রাখার চেষ্টা করেন?
নাসির আলী মামুন: মন যখন খারাপ থাকে, তখন খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গের সান্নিধ্য পেতে চাই। একই সাথে তাদের পোর্ট্রেট তুলি। বিশিষ্টজনদের কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুললে, তাদের সাথে কথা বললে মন কিছুটা ভালো লাগে।

মনের খবর: ভালো থাকার জন্য আপনার পরামর্শ কী?
নাসির আলী মামুন: এই দারিদ্র্য ও বঞ্চনার দেশে ভালো থাকা কঠিন। এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো, কারো কথা শুনবেন না। পরিবারকে সময় দিতে হবে। অনলাইনকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে হবে। নানা বিষয়ে পড়াশুনা করার চেষ্টা করলে মন কিছুটা ভালো লাগতে পারে। গান শোনা, ছবি দেখা, বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে আড্ডা আপনার মন ভালো রাখতে পারে। মনে ভালোবাসার বৃক্ষ রোপন করতে হবে। নিজের মধ্যে ভালোবাসার বাগান তৈরি করতে হবে।

মনের খবর: রাগেন? কীভাবে রাগ দমন করা যায়?
নাসির আলী মামুন: সাধারণত আমি রাগি না। ব্যক্তিগত কারণে রাগ কমই হয়। তরুণ প্রজন্মের ভুল পথে চলে যাওয়া দেখলে রাগ হয়। এখন তরুণদের জন্য অনেক পথ খোলা, আমাদের সময় তেমন ছিলো না। তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি, জঙ্গিবাদ দেখলে রাগ হয়। রাগ দমন নানাভাবেই করা যায়। বই পড়া, গান শোনা, ছবি তোলা, পরিবারকে সময় দেওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডার মাধ্যমে রাগ কমানো যায়।

মনের খবর: হতাশা বোধ করেন কখনো? কীভাবে হতাশা কাটিয়ে উঠা যায়?
নাসির আলী মামুন: আমি সাধারণত হতাশায় ভুগি না। জীবনের দীর্ঘ সময় দারিদ্র্যে কেটেছে, কিন্তু হতাশ হইনি। মন খারাপ হলে নিজের তোলা বিশিষ্টজনদের সামনে দাঁড়াই, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই, মন ভালো হয়ে যায়। হতাশা থেকে মুক্তির উপায় স্বপ্ন দেখা। হতাশার ক্ষেত্রে শুরুতেই ডাক্তারের কাছে না যাওয়াই ভালো, নিজেই নিজের মুক্তির উপায় খুঁজে বের করতে হবে। নিজেকেই নিজের অভিভাবক হিসেবে তৈরি করতে হবে।

মনের খবর: স্মৃতিকাতরতায় ভোগেন? কী ধরনের স্মৃতির মুখোমুখি হন?
নাসির আলী মামুন: স্মৃতিকাতরতায় বেশ ভুগি। আমার অনেক স্মৃতি। ক্যামেরা হাতে ৪৭ বছরে বিশিষ্টজনদের সাথেও অনেক স্মৃতি তৈরি হয়েছে। এসব স্মৃতি নিয়ে থাকি। বেশিরভাগ স্মৃতিই আনন্দের।

মনের খবর: কীভাবে ক্যামেরার সাথে জড়ালেন?
নাসির আলী মামুন: শৈশব থেকেই আমি খ্যাতিমান হতে চাইতাম। সবাই আমাকে চিনুক, এটাই ছিলো আমার ইচ্ছা। যখন আমার বয়স ৮/৯ বছর, তখন থেকেই আমার এমন ভাবনা ছিলো। তখন পত্রিকা থেকে বিখ্যাতদের ছবি কেটে রাখতাম। এভাবে খ্যাতিমানদের প্রতি এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়। নিজেরও খ্যাতিমান হতে ইচ্ছা করে। খ্যাতির মোহেই ক্যামেরার সাথে জড়িয়ে যাওয়া। ১৯৬৬ সালে একটি স্টুডিও থেকে নিয়ে আমি প্রথম ক্যামেরা ব্যবহার করি।

মনের খবর: ছবি তোলার ক্ষেত্রে পোট্রেটকে কেন বেছে নিলেন?
নাসির আলী মামুন: খ্যাতিমান হতে চাইতাম, কিন্তু কীভাবে খ্যাতিমান হওয়া যায়? ’৭২ সালের দিকে ভাবি, ক্যামেরা দিয়ে এমন কিছু করতে হবে, যা নতুন ও দেশের কাজে লাগবে। এক সময় ভেবে বের করি, বাংলাদেশে আলোকচিত্রীরা পোট্রেট ছবি তুলেন না। আমার মনে হলো, খ্যাতিমানদের পোট্রেট যদি তুলি, এটি একটি নতুন ধারার কাজ হবে, এতে আমারও খ্যাতি আসবে। ফলে আমি পোট্রেট তুলতে শুরু করি ’৭২ সালের জানুয়ারিতে। একসময় এই পোর্ট্রেট আমাকে আলোকচিত্রীদের মধ্য থেকে আলাদা করে এবং বাংলাদেশেও পোর্ট্রেট আলোকচিত্রের একটি ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

মনের খবর: নবীন আলোকচিত্রীর প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
নাসির আলী মামুন: এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো, ছবির ব্যাপারে কারো পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে না। সবাইকে লেখাপড়া করতে হবে। ছবি তোলার আগে ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। ইন্টারনেট থেকে এ বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে, নবীনদের এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। ফটোগ্রাফি সব চেয়ে উজ্জ্বল শিল্প। এখানে ভালো কাজ করতে পারলে সবাই চিনবে। ভালো ক্যামেরা না থাকলেও হতাশার কিছু নেই। এখন ক্যামেরার নানা বিকল্পও রয়েছে। ফটোগ্রাফিকে ভালোবাসুন, আপনারাও শিল্পী হবেন।

মনের খবর: আলোকচিত্র কীভাবে মনকে ভালো রাখতে পারে?
নাসির আলী মামুন: মন ভালো রাখার জন্য পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত যত প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব, তার মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্যামেরা। অন্যান্য যন্ত্রের তুলনায় ক্যামেরা সব চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। স্মৃতি ও ইতিহাস ধরে রাখা খুব আনন্দের ব্যাপার। ‘সেলফি’ এখন পৃথিবীর সব চেয়ে আকর্ষণীয় শব্দ।

মনের খবর: জাতির মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে আলোকচিত্র কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
নাসির আলী মামুন: সারা বিশ্বে এখন ঘরে ঘরে ফটোগ্রাফার। প্রত্যেকে যদিও শিল্পী নন, কিন্তু ছবি তো তুলছেন। ছবি তোলার মাধ্যমে তাদের নিজেদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছাকাছি আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ছবি আদান-প্রদানের মাধ্যমে পারষ্পরিক সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। ছবির চর্চার মাধ্যমে সবার আনন্দ হয়। তরুণদের এখন আগের মতো বিনোদনের ব্যবস্থা নেই, খেলাধুলার মাঠ নেই। ছবি তুললে তারা কিছুটা ভালো থাকতে পারবে, মাদকাসক্তি ও নানা অন্যায় থেকে কিছুটা বেঁচে থাকতে পারবে।

মনের খবর: নিজের তোলা প্রিয় ছবিগুলো সম্পর্কে বলুন?
নাসির আলী মামুন: নিজের তোলা সব ছবিই আমার প্রিয়। আমি যাদের ছবি তুলেছি, তারা দুর্দান্ত সৃষ্টিশীল। তারা সবাই আমার কাছে জীবিত। মন খারাপ হলে তাদের ছবি দেখে অনুপ্রেরণা পাই। মনে হয়, আবার হয়তো তাদের ছবি তুলতে পারবো। তাদের ছবির সামনে দাঁড়ালে মন খারাপ হওয়ার সুযোগ থাকে না।

মনের খবর: জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে যদি কিছু বলতেন?
নাসির আলী মামুন: অনেকে আমাকে বলে, আপনি তো এখনো জাতীয় পুরস্কার পাননি। কিন্তু আমি বলি, আমার মতো সম্মানের অধিকারী দেশের কোনো শিল্পী হতে পারেননি। ভালোবেসে শিল্পী কামরুল হাসান আমার দুটি পোর্ট্রেট এঁকে দিয়েছেন, শিল্পী এস এম সুলতান ৮ টি পোর্ট্রেট এঁকে দিয়েছেন, এছাড়াও শতাধিক শিল্পী আমার পোর্ট্রেট এঁকে দিয়েছেন। এমন সৌভাগ্যের অধিকারী কতজন হতে পারেন? এটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের চেয়ে বড় আনন্দের।

মনের খবর: বিশেষ কোনো ছবি তুলতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে কি?
নাসির আলী মামুন: শিল্পীর আক্ষেপের শেষ থাকে না। আমারও নানা আক্ষেপ রয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলার ছবি যদি তুলতে পারতাম! স্টিফেন হকিংয়ের ছবি তোলা নিয়েও আক্ষেপ ছিলো, কিন্তু ২০০৯ সালে সেই আশা পূরণ হয়েছে।

মনের খবর: আপনার কতগুলো প্রদর্শনী হয়েছে এবং কতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে?
নাসির আলী মামুন: আমার ছবি নিয়ে ৫৭ টি প্রদর্শনী হয়েছে। বই প্রকাশ হয়েছে ১২ টি।

মনের খবর: কবি শামসুর রাহমান যে আপনাকে ‘ক্যামেরার কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সেটা কখন কোন প্রেক্ষিতে?
নাসির আলী মামুন: ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় শামসুর রাহমানের কাব্য ‘গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহ্বান’। এই কাব্যটি তিনি আমাকে উৎসর্গ করেছেন। উৎসর্গপত্রে তিনি আমাকে ‘ক্যামেরার কবি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

মনের খবর: আলোকচিত্র নিয়ে আপনার আগামী পরিকল্পনা কী?
নাসির আলী মামুন: আমার ছবি নিয়ে ৫৭ টি প্রদর্শনী হয়েছে। আমি আরো অনেক এক্সিবিশন করতে চাই। ৪৭ বছরে অনেক ছবি জমে গেছে। বিখ্যাত এমন অনেকেই আছেন, যাদের একক ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করা যায়। আরো ফটোজিয়াম করতে চাই আগামী প্রজন্মের জন্য, তারা এসব ছবি দেখে ইতিহাসকে জানবে।

মনের খবর: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
নাসির আলী মামুন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

আমাদের সাথেই থাকুন

87,455FansLike
55FollowersFollow
62FollowersFollow
250SubscribersSubscribe

প্রিন্ট পিডিএফ পেতে - ক্লিক করুন

Most Popular

মাদকাসক্ত ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত হওয়ার অধিকতর ঝুঁকিতে

কোভিড-১৯ মহামারী এখন সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে গবেষণা বলছে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মাঝে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি...

মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণে সচেতনতা সৃষ্টিতে করণীয়

মানসিক ভাবে সুস্থ থাকতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়ে। কিন্তু সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন কুসংস্কার এবং অসচেতনতা আমাদের এই সেবা গ্রহণের...

দুরন্ত নাকি মানসিক সমস্যায় ভুগছে আপনার সন্তান

শিশুদের প্রতিনিয়ত রাগান্বিত বা আক্রমণাত্মক আচরণ সহ্য করা বাবা-মা অথবা শিক্ষক কারও জন্যই স্বাভাবিক বা সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। তাদের এই আবেগের বহি:প্রকাশ যদি বাড়ির...

নিজের যত্নে জরুরি বিষয়াবলী

নিজের নিয়ন্ত্রণ, উদ্যোগ ও ইচ্ছা প্রসূত হয়ে শরীরের যত্ন নেয়াকে সেলফ কেয়ার বা নিজের যত্ন নেয়া বলে। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হলে আগে নিজের...