বুদ্ধিমত্তার সমস্যাবলী!

0
50
বুদ্ধিমত্তার সমস্যাবলী!

ধরুন, বোকা হওয়াটা যদি পরম সুখের বিষয় হয়, তাহলে বুদ্ধিমান হওয়াটা কি ভয়াবহ দুর্দশার কারণ? জনপ্রিয় ধারণাটা কিন্তু এমনই। আমরা কিন্তু এরকমই ভেবে থাকি যে মেধাবীদের জীবন দুঃখ-কষ্ট-হতাশা আর একাকিত্বে জর্জরিত। ভার্জিনিয়া উলফ, এলান টারিং, লিসা সিম্পসনদের মত মানুষদের কথাই একবার ভাবুন। কি ভীষন নিঃসঙ্গ এক একজন তারকা! এতটাই একা যে তাদের মেধাকেও কুড়েকুড়ে খায় তাদেরই নিঃসঙ্গতা। একারণেই হয়তো আর্নেস্ট হেমিংওয়ে লিখেছেন, “ আমি জানি, বুদ্ধিমান সুখী মানুষ জগতে বড় দূর্লভ”।

বোকারাই সুখী কিনা, কিংবা বুদ্ধিমান মাত্রই অসুখী কিনা- এই প্রশ্ন হয়তো কারো কারো কাছে ভীষণ তুচ্ছ একটা বিষয়। তবে অনেকেই এই প্রশ্নের উত্তরটা জানতে চায়। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য তো কেবলই কেতাবি বিদ্যার উন্নয়ন ঘটানো। খুব কমই সেখানে বুদ্ধিমত্তার জোর কতটুকু আছে সেদিকে নজর দেয়া হয়। আমরা বইয়ের পর বই পড়ি, শিক্ষকের প্রতিটা লেকচার সাথে সাথে খাতায় তুলে নিই, ঘন্টার পর ঘন্টা মাথা খাটাই পরীক্ষায় কি আসবে সেটা ভেবে। আমি বলছি না এসব মানুষের জ্ঞাণের প্রসার ঘটায় না। জ্ঞাণ এতে অবশ্যই বাড়ে। কিন্তু জীবনের বড় বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কিন্তু পাঠ্যপুস্তক দিয়ে দেয় না। সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বিষয়। যে মানুষটা ক্লাসের প্রতিটা পরীক্ষায় সফল হয়েছিল সে হয়তো জীবনের পরীক্ষায় একজন ভীষণ মূর্খ হিসাবেও প্রমাণিত হতে পারে। ভেবে দেখুন তো খুব কি ভুল বললাম কিনা?

‘বোকারা সুখী, বুদ্ধিমানেরা অসুখী’-এই প্রশ্নের উত্তরের সন্ধান চলছে প্রায় শত বছর আগে থেকে যে সময়কে বলা হত ‘আমেরিকান জ্যাজের সময়’। সেসময়ে বিশ্বযুদ্ধের নিয়োগ কেন্দ্রগুলোতে এবং ১৯২৬ সালে মনোবিজ্ঞানী লুইস টারম্যানের সিদ্ধান্তে একদল অসম্ভব প্রতিভাবান শিশু বাছাইয়ে আইকিউ টেস্টের অসাধারণ ফলাফল সবাইকে আইকিউ টেস্টের প্রতি বেশ আকর্ষিত করছিল। লুইজ টারম্যান একটি স্কুলে আইকিউ টেস্টের মাধ্যমে ১৫০০ ছাত্রছাত্রী বাছাই করলেন যাদের আইকিউ লেভেল ছিল ১৪০-এর বেশী এবং এদের ভিতর ৮০ জনকে বাছাই করলেন যাদের আইকিউ লেভেল ১৭০-এর বেশী ছিল। এই ৮০ জন পরিচিত ছিল ‘টারমিটস’ নামে যাদের জীবনের উত্থান পতন সেই দিনটি থেকে টুকে রাখা শুরু হয়েছিল।

আপনারা নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করছেন- টারমিটসরা অবশ্যই খ্যাতি ও বিত্তে ভরপুর জীবন পেয়েছিল। হ্যা কেউ কেউ বিখ্যাত হয়েছিল বটে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে জেস ওপেনহেইমারের নাম যিনি ১৯৫০ সালের বিখ্যাত ক্লাসিক ‘আই লাভ লুসি’ লিখে খ্যাতি পেয়েছিলেন। এছাড়াও একই সময়ে সিবিএসে তার একটা সিরিজও প্রচার হত। টারমিটসদের গড়পরতা বেতন ছিল সাধারণ চাকুরীজীবীদের থেকে দ্বিগুণ। কিন্তু সব টারমিটসরা কিন্তু টারম্যান সাহেবের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। বরং কেউ কেউ তার থেকে কিছুটা নিচের দিকের চাকুরী যেমন পুলিশ, নাবিক, টাইপিস্ট পেশাও গ্রহন করেছিল। এই সব কারণেই লুইস টারম্যান সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, “ মেধা এবং কৃতিত্ব দুটো সম্পূর্ন আলাদা বিষয়´”। এমনকি বুদ্ধিমান মানুষেরা ব্যক্তিজীবনে সুখী নাও হতে পারেন। তাদের জীবনে ডিভোর্সের ঘটনার সংখ্যা, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যা এসবও সাধারণ মানুষদের থেকে নিতান্ত কম না।

এমনকি বারবার এটাও বলা হয়েছিল যে টারমিটদের যখন ভীমরতিতে পায় তখন তাদের প্রখর বুদ্ধিমত্তা, মূল্যবোধ কোনো কিছুই একটা ভাল জীবনে তাদের নিয়ে যায় না। আরো বেশী বলতে গেলে বলতে হয়- প্রখর বুদ্ধিমত্তা একজন মানুষকে আত্মতৃপ্ত যতটা না করে, তার থেকে জীবনের ব্যাপারে আরো বেশী অতৃপ্ত করে তোলে।

তবে এটাও কিন্তু বলছি না যে বেশী আইকিউ যাদের তারাই ভীষন দুখী।

বুদ্ধিমত্তা যখন দুঃখের কারণ
বুদ্ধিমত্তা কি আসলেই এমন কিছু যা মানুষের পায়ে বেড়ির মত লেগে থাকে? ১৯৯০ সালে যেসব টারমিটসরা জীবিত ছিল তাদেরকে তাদের গত ৮০ বছরের জীবনটা নিয়ে বলতে বলা হয়েছিল। তারা কিন্তু বলেনি যে তারা সাফল্য পায়নি, বরং তারা বলেছিল তাদের যৌবনের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। হয়তো অন্যদের তুলনায় বেশী বুদ্ধিমত্তা এবং সেই সাথে প্রত্যাশার চাপই তাদের অসুখী করে তুলত।

এবার আসুন আপনাদের একটা বিষন্ন গল্প শুনাই। গল্পটা সুফিয়া ইউসুফ নামের এক মেয়ের যাকে বলা হত  গণিতের বিস্ময়। এই মেয়েটি মাত্র ১২ বছর বয়সে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল তার অসম্ভব মেধার কারণে। নিশ্চয়ই ভাবছেন মেয়েটা অনেক বড় গণিতবিদ হতে পেরেছে? আপনারা শুনে হতাশ হবেন হয়তো- সুফিয়া ইউসুফ নামের মেয়েটা কোনো গণিতবিদ হয়নি। সুফিয়া ফাইনাল পরীক্ষার আগে অক্সফোর্ড থেকে ড্রপ আউট হয়ে ওয়েট্রেস হিসাবে কাজ শুরু করেছিল। তার চেয়েও বড় ট্রাজেডি হল- পরবর্তীতে সে পতিতাবৃত্তি বেছে নেয়। গণিতের দক্ষতা একেবারে যে কাজে লাগেনি, তা না। সুফিয়া যৌণক্রিয়া করার সময় গণিতের বিভিন্ন সমীকরণ আবৃত্তি করে তার খদ্দেরদের বিনোদন দিতো!

একটা প্রচলিত কথা হল- বুদ্ধিমান মানুষেরা নাকি কোনো ভাবে বুঝতে পারে যে পৃথিবীটা একটা অনর্থের দিকে ঝুকে যাচ্ছে দিনকে দিন। আমাদের সাধারণ চোখে যেটা ধরাই পরে না, বুদ্ধিমান মানুষের চোখে সেটাই ধরা পরে যায়। তারা খুব সহজে বুঝতে পারে মানুষের ভিতরের অবস্থা, দুঃখ হতাশা আর স্বার্থপরতা।

ক্রমাগত দুঃশ্চিন্তা সম্ভবত বুদ্ধিমান মানুষের লক্ষণই হবে! আলেকজান্ডার পেনি কানাদার মিশিওয়ান ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র ছাত্রীদের উপর পরীক্ষা করে দেখেন অপেক্ষাকৃত বেশী আইকিউয়ের মানুষেরা বেশী দুশ্চিন্তায় ভোগে। মজার বিষয় হল- বেশীর ভাগ দুশ্চিন্তাই খুব সাধারণ। এর মানে এই না যে তাদের চিন্তাগুলো খুব গভীর, বরং এর মানে এই মানুষগুলি সব বিষয় নিয়েই সব সময় চিন্তা করে।
পেনির মতে, “যখন খারাপ কিছু ঘটে তখন সেটা নিয়ে তারা আরো বেশী ভাবে!”

কঠিন একটা সত্য হল- অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা আর সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা- এই দুটো ভিন্ন বিষয়। হয়তো কোনো বিষয়ে আপনি মেধাবী হলেও কিছু ক্ষেত্রে আপনি একদম বোকার মত সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেলতে পারেন।

কিথ স্ট্যানোভিচ ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টোতে প্রায় এক দশক ধরে এটা নিয়েই নীরিক্ষা চালিয়েছেন এবং এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে ভাল আইকিউ লেভেলই পক্ষপাতশূন্য সিদ্ধান্ত গ্রহনে সহায়তা করে।

তবে এখানেই শেষ নয়।

সমস্যা হল, যাদের আইকিউ লেভেল ভালো তারা অনেক ক্ষেত্রেই নিজের দোষত্রুটির ব্যাপারে উদাসীন থাকে। অন্যদিকে অন্যের দোষত্রুটি নিয়েও সমালোচনায় মুখর থাকতে ভালোবাসে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তারা অনুমান নির্ভর সিদ্ধান্তে উপনিত হয়।
একারণেই হয়তো অধিকাংশ মেনসা ( উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন লোকদের একটা সংঘ) সদস্যরা প্যারানরমাল ব্যাপারগুলো বিশ্বাস করে।

সুতরাং যদি বুদ্ধিমত্তা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত কিংবা একটা সুন্দর জীবন না দিতে পারে তবে এর কাজটা কি? ইউনিভার্সিটি অফ কানাডার প্রফেসর ইগর গ্রোসম্যান মনে করেন আমাদের উচিত “জ্ঞানের” প্রাচীন ধারণায় আসা। আসলে জ্ঞান বিষয়টা কি? জ্ঞান হল সেটাই যেটা একজনকে একটা ভাল নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তে উপনিত হতে সাহায্য করে।

গ্রোসম্যান একটি পরীক্ষায় কিছু স্বেচ্ছাসেবকদের জোগার করেছিলেন যারা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছিল এবং তাদের জানার ভুলগুলোও বুঝতে পেরেছিল। মূলত এটাই হল জ্ঞান।

আপনার সন্তানের ভালো স্কোর কিংবা সিজিপিএ আসলো আর আপনি ধরে নিলেন তার জীবনটা খুব সুন্দর হবে, সুখী দাম্পত্য হবে, চিন্তা ভাবনা থাকবে না এসব ভেবে থাকলে বড় ধরনের ভুল করবেন। কারণ বুদ্ধিমান মানুষের ভিতর এসব কিছুই অনুপুস্থিত। গ্রোসম্যানের মতে আইকিউয়ের সাথে কোনো কিছুরই সম্পর্ক নেই। এবং আইকিউ বেশী মানেই এই নয় যে তারা জ্ঞানী।

জ্ঞানের শিক্ষা কিংবা শিখতে শিখতে জ্ঞান
ভবিষ্যতে হয়তো কর্মদক্ষতার চেয়ে আইকিউ টেস্টকেই প্রাধান্য দেয়া হবে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে। গুগোল তো ইতিমধ্যেই তা শুরু করে দিয়েছে।

সৌভাগ্যবশত জ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপ নেই। এবং এটা অনেকেরই বিশ্বাস যে জ্ঞান কোনো জন্মগত প্রাপ্তি নয়, এটা শিখতে শিখতেও অর্জণ করা যায়। অন্তত গ্রসম্যান সেটাই বিশ্বাস করেন। তিনি উল্লেখ করেন- সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা যখন অন্যজনের কাছে বিষয়টা আলোচনা করি তখন একটা মানসিক সক্ষমতা তৈরী হয়। ধরুন আপনি যাকে ভালোবাসেন তার সাথে আপনার কোনো সমস্যা হয়েছে। সেটি যখন আপনি আপনার ঘনিষ্ট বন্ধুর কাছে শেয়ার করবেন তখন হয়তো সে আপনাকে ভালো কোনো সিদ্ধান্ত দেবে যেটা আপনাকে বাস্তবতাটা বুঝতে সাহায্য করবে, ভুল বুঝতে সাহায্য করবে, আপনার ভুল ধারণাটা ভাঙ্গিয়ে দেবে।

তবে বড় চ্যালেঞ্জ হল নিজেদের ভুলটা বুঝতে শেখা। যদি সারা জীবন শুধু নিজের বুদ্ধিমত্তাকেই জয়মাল্য দিয়ে যান তবে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়াটা কষ্টসাধ্যই হবে কিছুটা। কারণ সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘সত্যিকারের জ্ঞানী সেই মানুষ যে মেনে নিতে পারে আসলে সে কিছুই জানেনা।

লিখেছেন,
নূর-ই-আয়শা শুচি ( David Robson এর The surprising downsides of being clever অবলম্বনে)

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here