শিশুদেরও মন আছে!

0
150
মন

গল্পটা পড়ে কেউ আবার সকল মাদ্রাসাকে এক রকম ভাববেন না। সকল অভিভাবক কিংবা শিক্ষকদেরকেও এক রকম ভাবার কারণ নাই।

কিছুদিন আগে আমার প্রাইভেট চেম্বারে একটি ১১ বছরের ক্ষীণ স্বাস্থ্যের অধিকারী ছেলেকে নিয়ে তার বাবা এবং চাচা দুইজন এসেছে পরামর্শ নিতে। ছেলেটি শেরপুর জেলার একটি নাম করা হাফেজী মাদ্রাসায় পড়ে। গত প্রায় এক মাস ধরে সে ঠিক মতো ঘুমায় না। হুজুরদের কথা শুনেনা। হঠাৎ হঠাৎকেমন জানি করে। বাবা মাকে গালাগাল করে। মন মরা হয়ে থাকে। মাদ্রাসায় নাকি আর পড়বে না। প্রথমে তাকে হুজুরগণ দোওয়া খায়ের করেছেন। তাবিজ কবজ পড়িয়েছেন, ঝাঁড়ফুক করেছেন। কবিরাজ কিছু গাছান্ত ঔষধ খাইয়েছেন। এক হুজুর বললো জ্বীনের আসর। জ্বীন তাড়ানোর চেষ্টাও হলো। কেউ বললো বান মেরেছে। তান্ত্রিককে দিয়ে মন্ত্র পড়ানো হলো। কিন্ত এভাবে ছেলের স্বাস্থ্য খারাপ হতে লাগলো। পড়াশোনা বন্ধ। ছেলেটি চুপ চাপ হয়ে গেলো। পাশের বাড়ীর এক লোক পরামর্শ দিলো, অনেক চেষ্টা তো করলে এবার একটু মাথার ডাক্তার দেখাও যদি কিছু হয়। তাই আমার কাছে নিয়ে এসেছে।

আমি দেখলাম শান্তশিষ্ট একটি ছেলে শুকনো মুখে বাবার পাশে এসে বসে পড়লো। আমি জিজ্ঞেস করলাম কি সমস্যা? চাচাই আগে শুরু করলো ডাক্তার সাব, ছেলেটে খুব ভালো ছাত্র ছিলো। স্কুলে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছে। মাস্টাররা ওকে অনেক আদর করতো। বাবা এবার যোগ করলো, আমরা ভাবলাম এতো মেধাবী ছেলেটাকে হাফেজ বানাই। আখেরাতেরও কাজ হবে। এই জগতেও সুনাম হবে। আমি এবার ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কি বাবা? সে একটু চুপ করে থাকলো। বাবা, চাচা দুই জনেই চেচিয়ে বললো, এই নাম কহ! আমি তাদের হাত তোলে মৃদু বাঁধা দিয়ে বললাম আস্তে বলুন। ছেলেটিকে বললাম আমার সাথে একা কথা বলবে? সে মাথা নাড়লো। তখন বাবা এবং চাচাকে বললাম। ৫ মিনিট একটু বাইরে বসুন। দেখি আমার সাথে একা কথা বলে কিনা? বললাম ঘাবড়াবেন না, এটেন্ডেন্স মেয়েটা থাকছে। প্রয়োজনে আপনাদের ডাকবো। একটু ইতস্ততভাবে তারা বাইরে গেলো। এবার আমার স্বভাব সুলভ ভংগিতে একটু নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম এবার বলোতো বাবা তোমার নাম কি? সে বললো মনির। ভালো করে তাকিয়ে দেখি তার মুখে বিষাদের কালো ছায়া। এবার বললাম তোমার বাবা চাচা তোমার ভালোর জন্যই ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছে। আমি কোন ইঞ্জেকশন দিবোনা। তোমার কোন ভয় নাই। একটু কি বলবে তুমি মাদ্রাসায় কেন যেতে চাওনা? সে বললো ভালো লাগেনা। কতদিন থেকে? বললো প্রথম থেকেই। বাবা মাকে বলেছিলে? হু। তারা কি বললো? তারা বললো যেতেই হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম তোমার স্কুল ভালো লাগে? হাঁ। মাথা নাড়লো।

জিজ্ঞেস করলাম মাদ্রাসা কেন ভালো লাগেনা? সে বললো রাত ১০ টায় ঘুমাই। ভোর ৪ টায় উঠে কোরআন পড়ি। তারপর ফজর নামাজ পড়ি। তারপর আবার পড়তে বসি। নাস্তা খাওয়ার পর আর একটু পড়ে সকাল ১০ টা-দুপুর ১২ টা ঘুমাই। আবার নামাজ পড়ে খেয়ে দেয়ে পড়তে বসি সন্ধ্যা নাগাদ। আমি বলি, খেলতে দেয়না? নাহ! না পড়লে মোটা বেত দিয়ে পিটায়। একবার বাড়ি যেতে চাইছিলাম, হুজুর তখন শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। আমি বললাম আহ! কষ্ট হয়েছে অনেক। সে মাথা নিচু করলো। এবার ওর কাধে হাত দিয়ে বললাম, যদি স্কুলে আবার ভর্তি করে দেয় তবে পড়বে। সে উৎসাহে মাথা নেড়ে বললো হু। কোরআন পড়বেনা? সে বললো, বিকেলে পড়বো। আমি অবাক হয়ে ওর সমাধান ওর কাছেই পেয়ে গেলাম।

এবার ডাকলাম ওর অভিভাবকদের। ছেলেটাকে এটেন্ডেন্স এর সাথে দিয়ে বললাম একটু বাইরে বসো। এবার তাদের বললাম, ছেলের তো অনেক কথাই শুনলাম। ওর তো মনে কষ্ট আছে। একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললো, ডাক্তার সাহেব, ভালো হবেতো? আমি বললাম অবশ্যই ভালো হবে। তবে, ও ছোট হলেও ওর মন আছে, ভালো লাগা, মন্দ লাগা আছে এগুলো বুঝতে হবে। ও কি কখনো বলেছিল ওর স্কুল ভালো লাগে? মাদ্রাসার কঠোর রুটিনে ওর কস্ট হয়? ওকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে? বেত দিয়ে মারে? এবার লজ্জিত গলায় বললো। জ্বি বলেছিল। ভেবেছিলাম শিক্ষক তার ছেলের ভালোর জন্যই সব কিছু করছে। আমি আর আমার আবেগ চেপে রাখতে পারিনাই, বলেছি আপনাদের এবং ঔ শিক্ষকদের, সকলেরই শাস্তি হওয়া উচিত। তারা লজ্জায় আর কিছু বললোনা। আমি একটু নরম হয়ে বললাম। আপনার ছেলেকে হয়তো আমি একটা বিষণ্ণতা রোধী ওষুধ দিবো। কয়েক মাস খেতে হবে। কিন্ত মূল সমস্যার সমাধান হলো ওর মনের বিরুদ্ধে ওর পড়াশোনা এবং থাকার পরিবেশের পরিবর্তন। সেটার কি হবে? তারা বললো, আপনি যেটা পরামর্শ দেন। আমি বললাম, আবারো ভুল করছেন? শিশুদের ও মন আছে। ছেলের সাথে খোলা মনে কথা বলুন। এতটুকু ছেলেকে কেন মাসের পর মাস হোস্টেলে রাখবেন। নিজের কাছে রেখে একটা আশেপাশের স্কুলে দিন। বিকেল বেলা হুজুর রেখে কোরান পড়াতেও পারবেন। সবাই সমান চাপ সামলাতে পারেনা।

এবার ছেলেটাকে ডাকলাম। বাবা চাচার সামনে বললাম। এবার স্কুলে ভর্তি হয়ে ভালো করে পড়াশোনা করবে তো? সে একটি মুচকি হাসি দিয়ে বাবার হাত ধরে বের হয়ে গেল। বাসে আসতে আসতে ওর হাসি মাখা মুখটা ভেসে উঠছে! ভাবছি ভালো করলাম না খারাপ করলাম? আল্লাহ মাফ করে দিও! মাদ্রাসা থেকে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়ে পাপ করিনি তো?

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ পেতে দেখুন: মনের খবর ব্লগ
করোনায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক টেলিসেবা পেতে দেখুন: সার্বক্ষণিক যোগাযোগ
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
করোনায় সচেতনতা বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও বার্তা দেখুন: সুস্থ থাকুন সর্তক থাকুন

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here