৮ ঘন্টা কাজ কেন

পেশার জগতে সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছানোর ইচ্ছে কার না থাকে। আর তাই উন্নতি, অর্থ আর সম্মানের পথে অবিরত ছুটে চলা। খাওয়া, ঘুম হারাম করে এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ঘাড়, মুখ গুঁজে দিবারাত্রি খেটে চলেছেন কত মানুষ। বিনোদন পালাই পালাই। আমাদের শরীর খুবই অনুগত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অকারণে তার ওপর চাপ বাড়াতেই থাকবেন। যত চাপ বাড়াবেন, তত তাড়াতাড়ি তার বিকল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কাজ করার মানে এই নয় যে আপনি অতি দক্ষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অফিসে কাটানো সাথর্ক করতে গিয়ে কমর্ক্ষমতা হারাতে চলেছেন, তা কি একবারের জন্যও ভেবে দেখেছেন? নিজ প্রয়োজনে বা মালিকশ্রেণির মুনাফা বৃদ্ধি যে কারণেই হোক, যারা দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি সময় অফিসে কাজ করে কাটান, তাদের জন্য কিন্তু ‘ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে মহাবিপদ।
একটি গবেষণা বলছে, দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে মৃত্যুর সময় এগিয়ে আসবে। শ্রম -আইন অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কমর্চারীদের দৈনিক কাজের স্বীকৃত সময় এখন ৮ঘণ্টা। কিন্তু সেই ৮ ঘণ্টাই নয়, এমনকি কমর্দিবস ১০-১২ ঘণ্টাতেও রুপান্তরিত হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) দাবি করে যে, বাংলাদেশের শ্রম-আইনে দৈনিক কমর্ঘণ্টা আট ঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও অন্তত ৮০ শতাংশ শ্রমিককে তার বেশি সময় কাজ করানো হয়। মাকির্ন যুক্তরাষ্টের মত উন্নত দেশেও ওভারটাইম এবং একস্টেন্ডেড ওয়ার্ক শিফট অনেক বেশি।
ওভারটাইম হচ্ছে সাপ্তাহিক ৪০ ঘণ্টার বেশি কাজ আর একস্টেন্ডেড ওয়ার্ক শিফট বলতে দৈনিক ৮ ঘণ্টার অধিক কাজকে বোঝায়। তবে বাৎসরিক কমর্ঘণ্টা হিসেবে সবচেয়ে ওপরে আছে দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং এবং থাইল্যান্ডের নাম।
গত ১০ বছর ধরে আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় চালানো গবেষণায় দেখা যায়, যারা প্রতি সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি অফিসে কাজ করেন, তাদের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ৩৫ ভাগ এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে তা অন্যান্য মানুষের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, ১৫ ভাগ ক্ষেত্রে বেড়ে যায় হাটের্র সমস্যাও। আর এই মারণরোগের হাত ধরে কখন যে ডায়াবেটিস শরীরে জায়গা করে নিয়েছে বুঝতেই পারবেন না। অর্থ আর উন্নতির লক্ষ্যে খাওয়া-ঘুম ভুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অফিসে কাজের ফলে শরীরে নিঃশব্দে বাসা বেঁধে আছে এই নীরব ঘাতক। আর ডায়াবেটিসের হাত ধরে আসছে আরো কয়েকটি মারণরোগ।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক জায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করা, কায়িক পরিশ্রমের অভাব ও অনিয়মিত জীবনযাপনের ফলে শরীরে দেখা দিচ্ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস।
লন্ডনের এক দল গবেষক দেখিয়েছেন যে, শুধমুাত্র এক সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করলেই শরীরে শকর্রার ভারসাম্য নষ্ট হয়। আর ডায়াবেটিস থাকলে, অন্যান্য রোগগুলি সহজে সারতেও চায় না। তাছাড়া ডায়াবেটিস আক্রান্ত হলে ক্লান্তিবোধ, ঘুমঘুম পাওয়া, অমনোযোগিতার মতো সমস্যাও দেখা দেয়।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় চালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অফিসে বেশি সময় কাটান তাদের মধ্যে অল্প বয়সে মত্যৃু ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ এবং যা ধূমপানের মতোই শরীরকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করতে থাকে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরীরকে বয়ে নিয়ে যায় মত্যৃুকূপে।
অতিরিক্ত কাজের চাপ শরীরে ডায়াবেটিস, হৃদরোগের ঝুঁকি যেমন বাড়াচ্ছে তেমনি নানাবিধ মানসিক সমস্যারও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ছাড়াও বিষণ্ণতার ঝুঁকি অনেক অনেক বেশি।
উন্নত বিশ্বের দেশ জাপান-যেখানে কাজের চাপ অনেক বেশি। সে দেশের গবেষকরা দেখেছেন যে, অধিক কাজ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়ে অপরিণত বয়সে মুত্যু ডেকে আনছে। জাপানিজরা একে ‘কারশি’ বলে অর্থাৎ অধিক কাজে মৃত্যু। সে দেশের গবেষকরা আরো দেখিয়েছেন যে, অধিক কাজ মানুেষর মধ্যে দুশ্চিন্তা, বিরক্তি, অস্থিরতার জন্ম দেয় এবং শরীরকে অবসন্ন করে।
বিভিন্ন দেশে চালিত প্রায় ২২টি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত কাজ  স্বাস্থ্যঝুঁকি, নানাবিধ দুঘর্টনা এমনকি মত্যৃুহার অনেক গুণ বৃদ্ধি করে। গবেষণায় এদের মধ্যে ধূমপান, মদ্যপানের মতো নেশাদব্র্য গ্রহণের মাত্রা যেমন বেশি দেখা গেছে তেমনি মনস্তাত্ত্বিক কাযর্ক্ষমতাও এদের কমে যাচ্ছে।
বেশি কাজ, বেশি ফল, ব্যাপারটা কি তাই? সইুডিস গবেষণা বলে ভিন্ন কথা। সুইডিস সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে অবসরপ্রাপ্ত সেবিকাদের মধ্যে চালিত গবেষণায় তাদের ৮ ঘণ্টা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দৈনিক ৬ ঘণ্টা কাজ দিয়ে দেখা গেছে, কাজের পরিমাণ ছাড়াও কাজের গুণগত মান যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি তাদের মধ্যে অসুস্থতাজনিত ছুটি, মানসিক চাপও অনেক কম ছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষক দেখিয়েছেন যে, দৈনিক ৪ ঘণ্টা কাজ করে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। প্রশ্ন ছিল ৮ ঘণ্টা কাজ করব কেন? যদি চান এই ধরণীতে আরো কিছটুা দিন  সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে, আরো অবকাশ, জীবনকে আরো উপভোগ্য করে গড়ে তুলতে তবে তো সেটাই উচিত।
আর এ ক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ ফল আমাদের পাশে আছে। গোটা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে আমারাও দ-ুহাত বাড়িয়ে বরণ করেছি মে দিবসকে। দুনিয়ার কসাইখানা হিসেবে পরিচিত মাকির্ন যুক্তরার্ষ্টের শিকাগো শহরের হে মাকের্টে ১৮৮৬ সালে ১লা মে, শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে সুশৃঙ্খল শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে মোকাবেলা করার জন্য গর্জে ওঠে বন্দুক। ঘামে ভেজা শ্রমিকদের জামা-কাপড় ক্ষতবিক্ষত দেহের রক্তে রাঙা হয়ে ওঠে।
শ্রমিকশ্রেণি তাঁদের জীবনের বিনিময়ে আমেরিকার ধূসর মাটিতে রক্তের অক্ষরে ইতিহাসের এক নতুন ও সুদূরপ্রসারী তাৎপযর্ময় অধ্যায় রচিত করে।
১৮৯০ সালে স্থির হয় বিশ্বব্যাপী ১লা মে তারিখটি মে দিবস হিসেবে পালিত হবে। এরপর থেকেই পহেলা মে দিনটিকে শ্রমিকরা আন্তর্জাতিকভাবে  মহান মে দিবস তথা শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন। বিশ্বের তিন ভাগের এক ভাগ এলাকার রাষ্ট্রীয়  ব্যবস্থায়  শ্রমিকশ্রেণির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানকার শ্রমজীবী মানুষের কাছে মে দিবস উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে।
কিন্তু বিশ্বের বাকি অংশের শ্রমজীবী মানুষ ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে এখনো এই দিনটিকে প্রতিজ্ঞা গ্রহণের দিন হিসেবে পালন করে। আমরা যারা অর্থ যশ আর অপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে অথবা অফিসের বসকে খুশি করতে দিবারাত্রি খেটে চলেছি আসুন এই দিনটিতে দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ না করার  প্রতিজ্ঞা করি। প্রতিজ্ঞা করি সুস্থভাবে বাঁচার, জীবনকে উপভোগ করার।
সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, ৫ম সংখ্যায় প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here