মনের অসুখে পুরুষের তুলনায় ভিন্ন প্রতিক্রিয়া করেন নারীরা

0
25
মানসিক চাপ নারীদের প্রজনন ক্ষমতা কমায়

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব মেন্টাল ইলনেসের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মানসিক রোগে আক্রান্ত। তবে মানসিক রোগ ও রোগের প্রভাবে ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া পুরুষ ও নারীর বেলায় ভিন্ন। আমেরিকার সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নাল অব অ্যাবনরমাল সাইকোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষকরা দেখেছেন, পুরুষের মধ্যে অপব্যবহার ও অসামাজিক আচরণ লক্ষণীয় মাত্রায় দেখা যায়, অন্যদিকে নারীরা মুখোমুখি হন উদ্বেগ, হতাশা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার। পুরুষ ও নারীর মানসিক অবস্থার এ ভিন্নতার কারণ হিসেবে জৈবিক, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।
নারীদের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ তাদের জীবনে হতাশার স্বীকার হন। আর এ হতাশার মাত্রা পুরুষের তুলনায় হয় দ্বিগুণ। কারণ গোটা জীবনে পুরুষের তুলনায় বেশি জৈবিক পরিবর্তন আসে নারীদের। এ পরিবর্তন ক্রিয়ার কারণে তাদের মানসিক চাপের সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষ করে হরমোনের প্রবাহ নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সন্তান জন্মদানের সময় হরমোন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে প্রসবের আগে ও পরে বিষণ্নতা দেখা যায়। তাছাড়া নারীদের মধ্যে প্রতি মাসে প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিস্ফোরিক ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে, যা বড় আকারের বিষণ্নতা ব্যাধির অনুরূপ। তাছাড়া সমাজে নারীদের মতামত ও অনুভূতির প্রকাশকে অন্তর্মুখী করে তোলার প্রবণতা মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। আর এ মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার লক্ষণ হিসেবে ক্লান্তি, প্রেরণা বা আগ্রহের অভাব, ঘন ঘন কান্নাকাটি এসবের কথা বর্ণনা করেন নারীরা, যা পুরুষের বেলায় কম দেখা যায়।
অ্যাংজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেসন অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার তথ্য অনুযায়ী, বাড়তি উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা, ভয় ও বিরক্তি ইত্যাদি লক্ষণ নিয়ে একদম বয়ঃসন্ধি থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীরা পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা উদ্বিগ্নতায় ভোগেন। ২০১২ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নাল অব অ্যাবনরমাল সাইকোলজির মূল অনুসন্ধান ছিল ‘আবেগ প্রকাশে পুরুষ বহির্মুখী ও নারী অন্তর্মুখী।’ তাতে দেখা গেছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নীতিমালার চাপ পুরুষ ও নারীর বেলায় আলাদা। সেক্ষেত্রে একজন নারী এসব নীতিকে কীভাবে নিচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে তার মানসিক অবস্থা। এক্ষেত্রে নারীদের হরমোনেরও প্রভাব রয়েছে। উদ্বিগ্নতার জন্য গবেষকরা  ইস্ট্রোজেন অ্যাস্ট্রোডিয়ালের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন। অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার কোনো বড় রকমের দুর্ঘটনার পরও দেখা দিতে পারে। যার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্যানিক ডিসঅর্ডার, ভয়  ইত্যাদি। যদিও তা পুরুষের ক্ষেত্রেও হয় কিন্তু নারীদের বেলায় এটি পুরুষের তুলনায় চারগুণ বেশি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে জানান নিউইয়র্কের লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও স্নায়ুবিজ্ঞানী জেনিফার ওয়লকিন। আঘাতমূলক ঘটনা, যৌন নির্যাতন ও আক্রমণ তাদের পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা দুর্ঘটনা-পরবর্তী মানসিক বৈকল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আঘাতমূলক ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া পুরুষের তুলনায় নারীরা প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিজেকেই দোষারোপ করেন এবং মনে করেন তাদের অক্ষমতার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, বলেন জেনিফার। তাছাড়া সেসব নারীর ক্ষেত্রে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) হওয়ার আশঙ্কা বেশি, যাদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও উদ্বেগ বিদ্যমান, বলেন জেনিফার।
নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে এমন আরেকটি সমস্যা হচ্ছে খাদ্যাভ্যাসে সমস্যা। যদিও কিছু পুরুষের বেলায় তা বিদ্যমান কিন্তু এটি মূলত নারীদের রোগ হিসেবে বিবেচিত। রোগটি পুরুষের চেয়ে নারীদের বেলায় হওয়ার আশঙ্কাও বেশি থাকে। খাদ্যাভ্যাসে সমস্যার সঙ্গে নারী-সংক্রান্ত বিষয়— আত্মনিয়ন্ত্রণ, আবেগ ও পূর্ণতার বিষয় জড়িত, বলেন যুক্তরাজ্যের বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডার অ্যাসোসিয়েশনের (বিইডিএ) বোর্ড সদস্য রাচেল পোর্টার।
বিলবোর্ড, টিভি বিজ্ঞাপন ও ম্যাগাজিনগুলোয় নারীদের পাতলা গড়ন ও ফিটনেসের ব্যাপারগুলোকে লক্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়। সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে নারীদের ওজন, আকৃতি ও সুন্দর চেহারার দিকে জোর দেয়া হয়। আর এ ব্যাপারটি খাবার ও শরীরের সঙ্গে নারীর সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। বিইডিএর তথ্য অনুযায়ী ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্ক ইটিং ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। তবে সেক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর মধ্যে খাদ্যাভ্যাস ও খাওয়া-দাওয়া নিয়ে অভিব্যক্তি ভিন্ন। যেমন— চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর পুরুষরা নিজেদের অভিব্যক্তিকে অকপটে প্রকাশ করেন, অন্যদিক নারীরা খেলেও তা লুকিয়ে যান এবং অপরাধবোধে ভোগেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here