ম্যালেরিওথেরাপি: মনোরোগ চিকিৎসায় পেয়েছিল নোবেল পুরস্কার

0
12

যদি প্রশ্ন করা হয় বিজ্ঞান বিষয়ে সবচেয়ে সম্মানসূচক পুরস্কার কোনটি? তবে নিশ্চয় সবাই সমস্বরে বলে উঠবে- নোবেল পুরস্কার। এতে কারোরই দ্বিমত নেই নিশ্চয়। যেসব আবিষ্কার বা তত্ত্বের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা সবই ছিল যুগান্তকারী, বদলে দিয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গতিপথ।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পেছনেও রয়েছে অনেক জীবনরক্ষাকারী ঔষধ বা চিকিৎসা পদ্ধতির আবিষ্কার অথবা রোগের কার্যকারণ সম্পর্কে নতুন তত্ত্ব। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ শাখা মনোরোগবিদ্যার ক্ষেত্রে অন্তত দু’বার এমন ঘটনা ঘটেছে। তার একটি নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন ‘ম্যালেরিওথেরাপি’।
এই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি একদিকে যেমন ছিল মনোরোগবিদ্যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ শাখা হিসেবে উজ্জ্বল স্বীকৃতি দান, অন্যদিকে ছিল বিরুদ্ধপক্ষ যারা মনোরোগবিদ্যাকে অস্তিত্বহীন  Pseudoscience বলতেন তাদের গন্ডদেশে এক বিরাট চপেটাঘাত। তা এই বিজয়ের যিনি মহানায়ক তিনি হলেন অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ Wagner Jauregg। আর তাঁর আবিষ্কারের নাম ‘ম্যালেরিওথেরাপি’। কেতাবি ভাষায় Discovery of the therapeutic value of malaria inoculation in the treatment of Dementia Paralytica। এবার আসি Dementia Paralytica সম্পর্কে। এটি আলোচনা করতে গেলে শুরু করতে হবে সিফিলিস থেকে। সিফিলিস যদি শুরুতেই চিকিৎসা না হয় তবে তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে এবং এই ধারাবাহিকতায় রোগটির তৃতীয় পর্যায়ে মস্তিষ্ক এবং তার শাখা-প্রশাখা আক্রান্ত হয় যাকে বলে নিউরোসিফিলিস। এটি ঘটতে সাধারণত ১০-৩০ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। তো নিউরোসিফিলিসের তিন রকম ধরনের একটি ধরন হচ্ছে General Paralysis of the Insane (GPI) অথবা Dementia Paralytica।এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে। শুরুতে অল্পবিস্তর ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, কখনো খুব ফুরফুরে ভাব সাথে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বড় কিছু দাবি করা। ক্রমে স্মৃতিভ্রম হওয়া, স্থান-কাল-পাত্র সম্পর্কে অসচেতনতা, জড়ানো কথাবার্তা, সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য কার্যক্রম যেমন-প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ অথবা উলঙ্গ হওয়া যুক্ত হতে থাকে।
সাথে সাথে বাড়তে থাকে মানসিক উন্মক্ততার অন্যান্য উপসর্গ যেমন- তীব্র ভ্রান্ত বিশ্বাস, হেলুসিনেশন। তার সাথে সাথে যুক্ত হয় শারীরিক কম্পন, ঝাঁকুনি এবং পরবর্তীতে মাংসপেশি দুর্বল হতে হতে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে চলৎশক্তি, বাকশক্তি হারিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে মৃত্যুর জন্য দিন গোনা।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়নি তাই সিফিলিসে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিণতিই ছিল নিউরোসিফিলিসে আক্রান্ত হওয়া। কোনো কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল না তখন। সেই চিকিৎসা খরায় মধুর বৃষ্টি হয়ে আসে ম্যালেরিওথেরাপি। অর্থাৎ Dementia Paralytica রোগীর শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবানু প্রবেশ করিয়ে কৃত্রিমভাবে তীব্র জ্বর তৈরি করা। জ্বী!! আপনি ঠিকই পড়ছেন। অদ্ভুত শোনালেও ম্যালেরিয়ার জীবানুই ঢোকানো হতো। তবে তা ছিল অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী প্লাজমোডিয়াম ভাইভেক্স এবং এভাবেই রোধ করা হতো Dementia Paralytica রোগের ক্রমাবনতি। ‘পাইরোথেরাপি’-এর একটি বিশেষ রূপ। কৃত্রিমভাবে জ্বর তৈরি করে বিভিন্ন রোগ উপশমে ব্যবহৃত প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতিই হলো ‘পাইরোথেরাপি’।  Dr. Julius Wagner-Jauregg প্রথমে Erysepelas এর Streptococcus  পরে যক্ষার জীবানু দিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু আশানুরুপ ফল পাওয়া যায়নি।
শেষে ম্যালেরিয়ার জীবানু দিয়ে মোক্ষলাভ হয়। এতেই এই থেরাপির নাম হয় ম্যালেরিওথেরাপি। ১৯১৮ সালে প্রথম এই পদ্ধতির সফল প্রয়োগ ঘটানো হয় যা রীতিমত চিকিৎসা দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দেয়। তৎকালীন মানসিক আশ্রমগুলো অন্তত ২৫% ছিল এই Dementia Paralytica এর রোগী। এদের চিকিৎসায় আশার আলো হিসেবে আসে এই চিকিৎসা। অসহায় সময়ের অসহায় রোগীদের এক দারুণ সহায়। আর এর স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৭ এ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন Dr. Julius Wagner-Jaureg ।
কয়েক বছর পরই ১৯২৯-এ পেনিসিলিন আবিষ্কারের মাধ্যমে সিফিলিস ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ চিকিৎসার দিগন্ত উন্মোচিত হয়। যদিও এতে উপযোগিতা হারাতে হারাতে একসময় বন্ধ হয়ে যায় ম্যালেরিওথেরাপি। তবু মনোরোগ চিকিৎসায় এটি একটি বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে সব সময়।
 
লেখক: ডা. তৈয়বুর রহমান রয়েল
রেসিডেন্ট, এমডি (সাইকিয়াট্রি), বঙ্গবন্ধু শেখ মজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here