ইলুশন

ইন্দ্রিয়গুলোর সঠিক সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করে আমাদের চলা-ফেরা, খাওয়া-দাওয়া সহ সব কাজ এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। বিপদের প্রতিরোধ কিংবা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত সবকিছুতেই আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো হলো বিশ্বস্ত বন্ধু ও দিক নির্দেশক। ছোট বড় শিশু বৃদ্ধ সকলের জন্যই এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম নেই।

কিন্তু এমন যদি হয় যে এই ইন্দ্রিয় নামক আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধুই কোনো কারণে বিগড়ে যায় অথবা বিকল হয়ে যায় অথবা আমাদের ভুল তথ্য প্রদান করতে শুরু করে- তাহলে কি হতে পারে! তাহলে কোনো কিছুই সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে না, সমস্যা হবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে। ‘ইলুশন’ হলো এমনই একটি ইন্দ্রিয়জাত তথ্য-পরিমাপের ভুল বা পরিবর্তিত অনুভব।

ইলুশন কি?
আমরা জানি, মানুষ কিংবা অন্য যেকোনো প্রাণি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পারিপার্শিক পরিবেশের অবস্থা সম্পর্কে তথ্যলাভ করে এবং সবকিছু অনুভব করে। ‘ইলুশন’ এর ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতিগুলো পরিবর্তিত হয়ে অনুভূত হয়। ইন্দ্রিয়গুলো ঠিকমতো অনুভূতি গ্রহণে বা প্রদানে সক্ষম হয় না, কিছুটা বিকৃত কিংবা পরিবর্তিত রূপে অনুভূত হয়। যাতে সহজেই একটি বিষয় বা বস্তু বা ঘটনা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। অনুভূতির বিষয়টিকে বিজ্ঞানের ভাষায় ভলা হয় ‘পারসেপশান’, আর ‘ইলুশন’ হলো ‘ডিসটর্টেট পারসেপশন’ বা পরিবর্তিত অনুভূতি।

মানুষের পাঁচ ধরনের ইদ্রিয়ের মধ্য থেকে যেকোনোটির কারণেই ইলুশন তৈরি হতে পারে। চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক যেকোনোটির অনুভবেই আসতে পারে এ পরিবর্তন। অন্য আরো কিছু বিশেষ অবস্থাতেও ইলুশন হয়। মোটকথা যে কোনো বিষয়ে স্বাভাবিক যে অনুভূতিটি হওয়ার কথা সেটি না হয়ে কম-বেশি পরিবর্তিত অনুভূতিই ইলুসন। ভিজুয়্যাল বা দেখার ক্ষেত্রে ইলুশনের পরিমাণ বেশি হলেও অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে।

কি হয়?
বাংলায় একটি প্রাচীন প্রবাদ রয়েছে, রজ্জুতে সর্প ভ্রম। অনেক সময় একটি দড়িকে হালকা আলোতে সাপ বলে মনে হতে পারে। এখানে হ্যালুসিনেশন-এর সাথে ইলুশনের পার্থক্য হলো, হ্যালুসিনেশনে বস্তুটি একেবারে অনুপস্থিত থাকে কিন্তু ইলুশনে বস্তুটির উপস্থিতি থাকে ঠিকই কিন্তু ব্যক্তির কাছে তা ভিন্নভাবে বা পরিবর্তিতভাবে অনুভূত হয়।

হালকা আলোতে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো গাছকে মানুষ মনে হতে পারে। একইভাবে অন্য ইন্দ্রিয়গুলোও এমন পরিবর্তিত আচরণ করতে পারে। বদ্ধ ঘরে থাকা অবস্থায় আকাশের গর্জনকে গোলাগুলি মনে হতে পারে, যান্ত্রিক কোনো শব্দকে কান্নার মতো মনে হতে পারে, একটি খাবারের স্বাদ অন্য আরেকটি খাবারের স্বাদের মতো মনে হতে পারে।

কগনেটিভ ইলুশন
কগনেটিভ ইলুশন একটি বিশেষ ধরনের অনুভূতি। স্বাভাবিক অবস্থায় বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অনুভূতিগুলো মানুষের মনে এক ধরনের ভিন্ন বা যৌগিক অনুভূতি তৈরি করে, যাকে আমরা বোধ বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে থাকি। ইলুশনের ক্ষেত্রে বোধের ভেতরেও পরিবর্তন আসতে পারে। কোনো একটি বিষয়কে বুঝতে গিয়ে বিভ্রান্ত বা অন্য অর্থ তৈরি হতে পারে, যাকে কেউ কেউ ‘কগনেটিভ ইলুশন’ বলে থাকে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা একদল মানুষকে দেখে মনে হতে পারে তারা আমাকে খুন করার জন্যই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু লোকগুলো হয়তো সম্পুর্ণ অন্য কোনো কারণে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের মধ্যে কিংবা টার্গেট কোনো গ্রুপের ভেতর কগনেটিভ ইলুশন তৈরি করার জন্য কোনো একটি কর্মসূচি দেয়া যেতে পারে, যার আপাত বা দৃশ্যত অর্থ এক হলেও অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পুর্ণ ভিন্ন। একটি ছবির ক্ষেত্রে বিদ্যমান রঙ বা বস্তুর অবস্থা সরাসরি প্রকাশ না করে অন্য অর্থ প্রকাশ করতে পারে। নাটক বা সিনেমায় আলো দিয়ে বা মিউজিক দিয়ে বিশেষ এক ধরনের পরিবেশ তৈরি করাও বোধের এক প্রকার ইলুশন।

ইলুশন কেন হয়?
ইলুশনের বিজ্ঞানটি হলো স্বাভাবিক অনুভূতির জন্য প্রয়োজনীয় স্টিমুলেসন এর অভাব অথবা অতিরিক্ত স্টিমুলেসন। সুস্থ এবং অসুস্থ এই দুই অবস্থায়ই ইলুশন হতে পারে। পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত স্টিমুলেশন এর হেরফের কিংবা ইন্দ্রিয়গুলোর অসুস্থতা দুই কারণেই ইলুশন হতে পারে।
আলোর স্বল্পতার কারণে দড়িকে সাপ মনে হতে পারে, কিন্তু স্পষ্ট আলোতে সেটিকে দড়িই মনে হবে। আবার পূর্ণ আলোতে দড়িটি যদি দূরে থাকে তাহলেও তাকে সাপ মনে হতে পারে। পূর্ণ, সঠিক, পরিমিত ও স্বচ্ছ স্টিমুলেশনের অভাবের কারণেই ইলুশন তৈরি হতে পারে।

অসুস্থতার ক্ষেত্রে যা ঘটে
সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত স্টিমুলেসনের উপর নির্ভর করে থাকে। কিন্তু অসুস্থতার ক্ষেত্রে দুই ধরনের সমস্যা হতে পারে। এক, পরিবেশের তারতম্য কিংবা ইন্দ্রিয়গুলির ভেতর ঘটে যাওয়া কোনো সমস্যা বা সংবেদশীলতা কমে কিংবা বেড়ে যেতে পারে। ডেলিরিয়াম তারমধ্যে সবচে কমন কন্ডিশন। ডেলিরিয়ামে ইলুশন সবচেয়ে বেশি হয়। এছাড়া হঠাৎ বেড়ে যাওয়া জ্বর, বিশেষ বিশেষ মানসিক রোগ, নেশার যেকোনো পর্যায়, মস্তিষ্কের টিউমার, ইলেক্ট্রোলাই ইমব্যালেন্স সহ শরীরের যেকোনো ধরনের বড় সমস্যায় ইলুশন হতে পারে।

আবার অতিরিক্ত ক্লান্তি, কম ঘুম, অতিরিক্ত ভয়, দীর্ঘক্ষণ গরমে থাকা কিংবা অতিরিক্ত ঠান্ডার মধ্যে থাকার ফলে সুস্থ মানুষেরও ইলুশন হতে পারে। কোনো কোনো ওষুধের প্রতিক্রিয়াতেও এমন হতে পারে।
ইলুশনে ছোট জিনিষকে বড় বা বড় জিনিষকে ছোট মনে হতে পারে। কালোকে সাদা, সাদাকে লাল বা বিভিন্ন রঙের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। মানসিক অবস্থার সাথেও ইলুশন সম্পর্কিত। যেমন, কারো মধ্যে যদি ‘ডিলুশন’ থাকে যে কেউ তার ক্ষতি করতে পারে, সেক্ষেত্রে সাধারণ কেউ তার ঘরে ঢুকলেই তার মনে হতে পারে লোকটি তার ক্ষতি করবে।

ইলুশনের স্বাভাবিক ব্যবহার
যাদুশিল্পে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন রকমের আঁকা ছবিতেও অনেক ইলুশনের ব্যবহার থাকে। নাটক কিংবা ফিল্মে এমনকি বড় বড় স্টেজ শোতেও ইলুশন তৈরি করা হয়, যেসবের বেশিরভাগই ভিজুয়্যাল বা কগনেটিভ ইলুশন।

মানসিক বিষয়ক বেশকিছু পরীক্ষাতে এক ধরনের ছবির ব্যবহার হয়ে থাকে। মানুষের বিচার বুদ্ধি ও বোধ নিরুপনেও এ ধরনের ইলুশনাল ছবি ব্যবহার করা হয়।

অসুবিধা
অসুস্থতার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিষয়গুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। ইলুশনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কারণে যেকোনো বড় দুর্ঘটনা বা বিপদ ঘটে যেতে পারে। ভয় পেয়ে বা ভুল বুঝে কেউ কাউকে গুরুতর আঘাত পর্যন্ত করতে পারে।

চিকিৎসা
স্বাভাবিক ক্ষেত্রে ইলুশন খুবই স্বল্প মেয়াদী হয়ে থাকে। অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘুমের কারণে এমন সমস্যা হয়ে থাকলে তা দ্রুতই ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু যদি রোগের কারণে হয়, তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং তা দ্রুততার সাথে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here