করোনায় মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে স্বজন বিহীন মৃত্যু এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

0
63
মৃতদেহে ৩ ঘন্টা পর নিস্ক্রিয় হয় করোনা, দাফন করা যাবে যেকোনো জায়াগায়

কোভিড-১৯ মহামারী মৃত্যুকে যেন করেছে আরও অমানবিক। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু আমাদের কারোরই কাম্য নয় যে মৃত্যুতে পাশে থাকেনা কোন স্বজন, শোক প্রকাশেও এঁকে দেওয়া হয় বাধ্য বাধকতার গণ্ডী। করোনার পাশাপাশি মৃত্যু নিয়ে এই মানসিক উৎকণ্ঠাও আমাদের চরমভাবে ভোগাচ্ছে।

করোনা সংক্রমণের ভয় আমাদের স্বাভাবিক কাজ কর্মে প্রচণ্ড ব্যাঘাত ঘটিয়ে চলেছে। দীর্ঘ দিন ধরে আমরা গৃহবন্দী জীবন যাপন করছি। সবার সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে সমাজ সামাজিকতা, আমোদ আহ্লাদ সব কিছু যেন ভুলে গেছি। এমনকি কোন মৃত্যু সংবাদে আমরা তাদের সাথে সামিল হতে পারছিনা, শোক প্রকাশ করতে পারছিনা কাছে গিয়ে। যারা করোনা মহামারীর এই দুঃসময়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মৃত্যু বরণ করছে তাদের মৃত্যু হচ্ছে একাকী, সবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। আবার মৃত্যুর পর নিকট আত্মীয় কিংবা পরিচিত মানুষ জন, কেউই যেতে পারছে না কাছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেহ সংস্কারের কাজ করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য কর্মীদের। করোনা কালীন সময়ে অহরহ এমন অমানবিক দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছে আমাদের চারদিকে যা আমাদের হৃদয়ে তৈরি করছে এক গভীর ক্ষত এবং মনের মাঝে সৃষ্টি করছে এক চরম শঙ্কা। মৃত্যুকে এক দিন সবাইকেই মেনে নিতে হবে। কিন্তু আমরা চাইনা এমন অমানবিক, ভয়ঙ্কর মৃত্যু যে মৃত্যুতে অন্তিম যাত্রায় আমরা কাউকেই কাছে পাবনা।

কোয়ারেন্টাইন এবং আইসোলেশনে সব থেকে বেশী মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে  তারা যাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা কম বা যারা একা থাকে। করোনা আক্রান্ত হয়ে একদম একাকী করোনার সাথে লড়াই করছেন তারা এবং ভাগ্যের কাছে হেরে গেলে একাকীই মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে তাদের। মৃত্যুর সময়ে আপনজনদের সান্নিধ্য, নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করা, তাদের মনের ভাবে সিক্ত হওয়া কিংবা আলিঙ্গন, স্পর্শ এসব কিছু থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে যা খুবই দুঃখজনক। এর ফলে মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের মনের মাঝে রয়ে যাচ্ছে এক অপরিসীম কষ্ট। যারা এভাবে অকালে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে, তাদের আত্মীয় স্বজনেরা মনস্তাত্ত্বিক পীড়া এবং আত্ম গ্লানিতে ভুগছেন যে শেষ সময়ে তারা কোন রকম সহায়তা পারছে না। এমনকি সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় কাছেও যেতে পারছেনা। আর যারা করোনা ছাড়া অন্য কোন অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করছে তাদের কাছের মানুষেরা ভাবছেন তারা হয়তো করোনা পরিস্থিতির কারণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। তাদের মনে এমন ধারণা জন্মাচ্ছে যে করোনাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তারা হয়তো সেই অসুস্থ মানুষটিকে অবহেলা করেছেন।

এমনকি বর্তমান দুঃসময়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কর্ম গুলোও আমাদের ঠিক মনের মত বা যা আমরা চাই এবং আগে যেভাবে হত ঠিক তেমনটা হচ্ছেনা। এছাড়াও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলে বিধি নিষেধ থাকায় অনেকেই ইচ্ছে থাকলেও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছে না। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সকল অন্তরঙ্গ মনোভাব থেকে মৃতের আত্মীয় এবং অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়াও যেহেতু সকল ধরণের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য কোন সামাজিক বা লৌকিক আচার পালন করাও সম্ভব হচ্ছেনা। পরিবার এবং কাছের মানুষদের নৈকট্য ছাড়াই একজন মৃত্যু পথযাত্রী শেষ বিদায় নিচ্ছেন। এর থেকে মর্মস্পর্শী আর কি হতে পারে!

এমন পরিস্থিতিতে আমরা যারা বেঁচে আছি, আমরা সবাইই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছি। আমাদের মাঝে এক চরম মানসিক উৎকণ্ঠা কাজ করছে। আমরাও ভাবতে বাধ্য হচ্ছি যে আমাদের ভবিষ্যৎ ও একই রকম হবেনা তো? আমাদেরকেও এভাবে নিজেদের কাছের মানুষদের থেকে দূরে কোন হাসপাতালের বিছানায় একাকী মৃত্যুবরণ করতে হবেনা তো? আমরা অনবরত প্রার্থনা করছি যেন এভাবে অমানবিক মৃত্যুবরণ করতে আমাদের না হয়। সৃষ্টিকর্তা যেন এমন মৃত্যুর সাক্ষী আমাদের না করেন।

প্রত্যেক প্রাণীর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু কেউই এমন হতাশা এবং কষ্টের মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করতে চাইবেনা। আমরা প্রত্যাশা করব এমন অবস্থা খুব দ্রুত পরিবর্তন হবে। এসব ভেবে প্রতিনিয়ত নিজেদের মানসিক ও শারীরিক পীড়াগ্রস্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সুরক্ষিত থাকার চেষ্টা করতে হবে। করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকাই এখন আমাদের একমাত্র করণীয়। আর আমরা অবশ্যই এতে সফল হবো কারণ আমরা আত্মবিশ্বাসী। আমরা এই অমানবিক ও দুর্দশাগ্রস্ত মৃত্যু চাইনা।

সূত্র: https://www.psychologytoday.com/intl/blog/good-mourning/202009/not-the-way-i-wanted-it-be

অনুবাদ করেছেন: প্রত্যাশা বিশ্বাস প্রজ্ঞা

করোনায় স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here